আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা, নতুন পুলিশ প্রধান নিয়োগ নিয়ে আলোচনায় যারা

পুলিশ প্রধান হিসেবে কাউকে মূল্যায়নের আগে তার কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিগত আচরণ, চারিত্রিক দিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ বিবেচনা করা হয়।

আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা, নতুন পুলিশ প্রধান নিয়োগ নিয়ে আলোচনায় যারা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে মন্তব্যের পর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরকে অপসারণের দাবি উঠেছে। এর মধ্যেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে নতুন আইজিপি নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, “সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ারে যেতে দ্বিধাবোধ করবে না।”

একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়া হয়, আর নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ বলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার ওপরও তিনি জোর দেন।

এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। একাধিক রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী ও সংগঠন এবং সুশীল সমাজ তাকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে।

মঙ্গলবার রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মন্তব্যটিকে সরকারের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলে অভিহিত করেন।

মন্তব্যের দিন রাতেই পুলিশ সদর দপ্তর এক ব্যাখ্যায় জানায়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারবহির্ভূত শাস্তি বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। তাদের ভাষ্য, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতে তিনি রূপক অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, আইজিপি অসাবধানতাবশত এমন মন্তব্য করেছেন। তবুও আইজিপি পদে বদল আসতে বেশি দেরি নেই, এমন গুঞ্জন উঠেছে।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার তিনজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, পুলিশ প্রধান হিসেবে কাউকে মূল্যায়নের আগে তার কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিগত আচরণ, চারিত্রিক দিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ বিবেচনা করা হয়। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই সূত্রগুলো জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সংবলিত নথি নিয়ে কাজ করছে। এরা হলেন:

– স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ

– আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ

– অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন

– রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই চারজন পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

অপর একটি সূত্র বলছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নামও পুলিশ প্রধান হিসেবে আলোচনায় আছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অতীত কার্যক্রম এবং এই পদের দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতার ওপর।

আহসান হাবিব পলাশ, এসআরবি

অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ নবগঠিত এসআরবির (সাবেক র‍্যাব) প্রথম মহাপরিচালক। এর আগে তিনি র‍্যাবের সর্বশেষ ডিজি ছিলেন।

তিনি ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং ১৯৯৫ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া থেকে তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।

হাসিব আজিজ, এপিবিএন

হাসিব আজিজ অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় এপিবিএনের প্রধান। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে শরীয়তপুরে জন্ম নেওয়া হাসিব আজিজ সাবেক আইজিপি এম আজিজুল হকের সন্তান, যিনি ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও ছিলেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হন। প্রায় দেড় বছর পর ২০২৬ সালের মার্চে তাকে এপিবিএন প্রধান করা হয়। সিএমপি প্রধান হওয়ার আগে তিনি সিআইডির অধীনে ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট ছিলেন। এ ছাড়া ইন্টারপোল ডেস্কের প্রধান, টাঙ্গাইল পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট এবং এপিবিএন সদর দপ্তরের বিভিন্ন পদেও কাজ করেছেন।

মোশাররফ হোসেন, সিআইডি

অতিরিক্ত আইজিপি মোশাররফ হোসেন ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে সিআইডি প্রধানের দায়িত্ব নেন। তিনিও ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং ১৯৯৫ সালে এএসপি হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন, আর যুক্তরাজ্যে আইনে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন।

সিআইডিতে আসার আগে তিনি প্রেষণে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক ছিলেন। ওই পদে থাকাকালেই তিনি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান।

মাঠ পর্যায়ে তিনি পিরোজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। সিআইডি সদর দপ্তর এবং এর চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ইউনিটেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ডিএমপি, সিএমপি, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ও পুলিশ সদর দপ্তরেও কাজ করেছেন।

২০২৬ সালের মার্চে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি র‍্যাবের ডিজি নিযুক্ত হন এবং ২৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন। সেপ্টেম্বরে তিনি এসআরবির প্রথম প্রধান হন। র‍্যাবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন। এর আগে তিনি ডিএমপি, সিএমপি, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, এপিবিএন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং বিভিন্ন জেলার মাঠ পর্যায়ের পদে কাজ করেছেন।

ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান, রেলওয়ে পুলিশ

ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান রেলওয়ে পুলিশের প্রধান (অতিরিক্ত আইজিপি, চলতি দায়িত্ব)। তিনি বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, রাজশাহীর প্রিন্সিপাল এবং মৌলভীবাজার ও ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার ছিলেন।

১৫তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা যুক্তরাজ্যের লিঙ্কনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রি নিয়েছেন। তিনি একজন পিএইচডি ফেলো।

১৯৯৭ সালে আওয়ামী সরকার তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে, আর ২০২২ সালে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। পরে তাকে দেশ ছাড়তে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আন্দোলনে তিনি সরাসরি অংশ নেন।

সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ