গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কালীগঞ্জে একের পর এক ঘটেই চলছে ডাকাতির ঘটনা। সর্বশেষ ২৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নাগরী ইউনিয়নের লুদুরিয়া এলাকায় সড়কের গাছ কেটে ফেলে বরযাত্রী ফেরত একটি প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে প্রায় পৌণে চার লাখ টাকা মূল্যের মালামাল লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দল।
কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গত ৩০ নভেম্বর থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৮৭ দিনে একটি চুরির ঘটনাসহ ডাকাতির ঘটনা ঘটছে পাঁচটি। এর মধ্যে শুধু একটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ৭ জন এবং এক সহযোগীকে প্রথমে পরে আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করে লুন্ঠিত হওয়া মালামাল উদ্ধার করতে পেরেছে পুলিশ। বাকী ঘটনাগুলোর এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
আর এভাবে ডাকাতির ঘটনা দিন দিন বাড়তে থাকায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সর্বশেষ বরযাত্রী ফেরত প্রাইভেটকারে ডাকাতির ঘটনায় ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নাগরী ইউনিয়নে ভুরুলিয়া গ্রামের মৃত মোহন গমেজের ছেলে রুপন গমেজ স্ত্রী, ছেলে এবং দুই প্রতিবেশী প্রাইভেটকারে করে বরযাত্রীসহ নলছাটা এলাকায় যায়। পরে বরযাত্রী রেখে প্রাইভেটকারে করে বাড়িতে ফেরার পথে মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে লুদুরিয়া এলাকার ব্রিজের উত্তর পাশের রাস্তায় পৌঁছালে রাস্তার গাছ পড়ে থাকতে দেখে গাড়ি গতিরোধ করলে ৮-১০ সদস্যের একটি ডাকাতদল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রাইভেটকার ঘেরাও করে এবং জোরপূর্বক গাড়ির দরজা খুলে গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীদের জিম্মি করে মারপিট করে। এছাড়াও গাড়ির পেছনে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলযোগে আসে তাদের প্রতিবেশীদেরও একই কায়দায় জিম্মি করে মারপিট করে।
ওই সময় তাদের সঙ্গে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির দশটি মোবাইল ফোনসেট (আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ৮২ হাজার ৭’শত টাকা), দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার (আনুমানিক মূল্য ১ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা), ১ ভরি ওজনের রুপার চেইন (মূল্য ৮শত টাকা) এবং একটি টর্চলাইট (আনুমানিক মূল্য ১৫ শত টাকা) মোট ২ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দল।
ডাকাতির ঘটনায় রুপন গমেজে বাদী হয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন{মামলা নাম্বার ৩৬(০২)২০}।
রুপন গমেজের মামা বাবুল তালুকদার বলেন, ঘটনার পর খবর পেয়ে প্রথমে পুলিশকে খবর দেই এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি। এখন পর্যন্ত ডাকাির ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক(তদন্ত) সোহেল রানা বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মামলার তদন্ত চলছে। এই ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য : এর অগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দিবাগত কালীগঞ্জের আজমতপুর চৌরাস্তার আরফান ট্রেডার্স নামে একটি দোকান থেকে ২৫/২৬টি গ্যাসের সিলিন্ডার, এক লিটারের মবিল ক্যান ৪০-৪২টি, ৫ লিটার ১৬ টি মবিল ক্যান ও নগদ টাকা চুরি করে। সে সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ৩/৪ জনের সঙ্গবদ্ধ চোর চক্র পিকআপে উঠে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে। তাদেরকে ধাওয়া করলে পিকআপে থেকে ঢিল ছুড়েঁ মারলে কনস্টেবল রাজ্জাকের মাথায় লেগে গুরুতর আহত হয়। পরে চোর চক্র চুরি করা মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়। চুরির ঘটনায় দোকানের মালিক আরিফ বেপারী বাদী মামলা দায়ের করেছেন।

এর একদিন আগে ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে কালীগঞ্জের সাওরাইদ বাজারে নিরাপত্তা প্রহরীদের হাত-পা বেঁধে দুইটি স্বর্ণের দোকানসহ ১২ দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ওইদিন আনুমানিক রাত ১টার দিকে দেশীয় অস্ত্রসহ একদল ডাকাত পিকআপে করে সাওরাইদ বাজারে হানা দেয় এবং বাজারে থাকা চার-পাঁচজন নিরাপত্তা প্রহরীর হাত-পা বেঁধে বাজারের এক গলির মধ্যে আটকে রাখে। পরে ডাকাতেরা বাজারের কৃষ্ণ রায় শিল্পালয় থেকে ৩ ভরি স্বর্ণ, লোকনাথ শিল্পালয় থেকে ২ ভরি স্বর্ণ, ফাহাদ টেলিকম, শরীফ ইলেকট্রনিক্স, আওলদ টেলিকম, মাসুদের মুদি দোকান, আজাহার স্টোর, আরিফ হার্ডওয়ার্ক, জামান সেনেটারী দোকান, আজিম উদ্দিন এর ভাই ভাই টেলিকমসহ ১২টি দোকানের তালা ভেঙ্গে নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে পালিয়ে যায়।
ওই ঘটনায় ব্যবসায়ী আওলদ হোসেন বাদী হয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি কালীগঞ্জ থানায় একটি ডাকাতির মামলা দায়ের করেছেন{মামলা নাম্বার ০৮(০২)২০}।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মুজাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, লুট হওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি পিকআপ উদ্ধার করে জব্দ হয়েছে তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
দ্রুত ডাকাত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

আরো জানা যায়, ২০১৯ সালের ০৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে কালীগঞ্জের উলুখোলা ফাঁড়ির পাশেই উলুখোলা বাজারে ‘আইনের লোক পরিচয়ে’ পাঁচ স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওইদিন দিবাগত রাত অনুমানিক ১ টার দিকে মুখোশধারী একদল ডাকাত বন্দুক, পিস্তল, রাম-দা, ছুরাসহ তালা কাটার যন্ত্র, বাঁশি, টচ লাইট ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে অজ্ঞাতনামা ১৫/১৬ জন ডাকাত বাজারে প্রবেশ করে। পরে বাজারে থাকা সাতজন পাহারাদারসহ বাজারের অন্যান্য ১০/১২ জন দোকানদার ও ৪/৫ জন পথচারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিজেদের ‘আইনের লোক পরিচয়ে’ এক দোকানের ভেতরে নিয়ে বন্দী করে প্রবেশদ্বারে পাহারা বসিয়ে দেয়। এরপর জুয়েলার্সের দোকানের শাটারের তালা কেটে একে একে পাঁচ দোকানের সিন্দুকে থাকা ৪৪ ভরি স্বর্ণ ও ৩৪০ ভরি রুপা এবং নগদ প্রায় দুই লাখ টাকা লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায়।
ডাকাতদল প্রায় এক ঘন্টায় ডাকাতি সংঘটিত করেছে বলে মামলার নথি থেকে জানা যায়।
ডাকাতির ঘটনায় রূপশ্রী শিল্পালয়ের মালিক দীপংকর দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় ১৫/১৬ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন{মামলা নাম্বার ০৬(১২)১৯}।।
ওই ঘটনার পর উলুখোলা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই রূপন চন্দ্র সরকারসহ ১৪ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিল প্রথমে কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক সোহেল রানা। পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্টে (সিআইডি)’ হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্টে (সিআইডি)।
মামলার বাদী দীপংকর দাস বলেন, ডাকাতির ঘটনায় এখনো পর্যন্ত লুট হওয়া কোন মালামাল উদ্ধার বা কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে মামলার তদন্তকারী সিআইডি’র কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
এছাড়াও এর নয় দিন আগে ৩০ নভেম্বর দিবাগত রাতে কালীগঞ্জের বাঘারপাড়া এলাকায় কালীগঞ্জ-ঘোড়াশাল বাইপাস সড়কে বাঘারপাড়া নামকস্থানে একটি প্রাইভেটকারের সামনে গাছ কেটে ফেলে গতিরোধ করা হয়। এ সময় ওই ডাকাত দল প্রাইভেটকারের মালিক ডাঃ আসাদুজ্জামানের কাছ থেকে নগদ ৮০ হাজার টাকা ও চারটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে আরেকটি যাত্রীবাহী বাসের গতিরোধ করলে এক যাত্রী ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করলে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে এবং ডাকাতরা পালিয়ে যায়। পরে ওই ঘটনায় পরদিন সকালে (১ ডিসেম্বর) ডাঃ আসাদুজ্জামান কালীগঞ্জ থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করেন {মামলা নাম্বার ০২(১২)১৯}।
সেই মামলার প্রেক্ষিতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) একেএম মিজানুল হকের নেতৃত্বে ২ দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করে টঙ্গী, ঢাকা, বি-বাড়ীয়া ও নরসিংদী থেকে ওই ডাকাতির সাথে সরাসরি জড়িত ৭ জন এবং এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, মোবাইল সেট, দেশী অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত ডাকাতদের কাছ থেকে নগদ ৫ হাজার ৬৫৫ টাকা, ১২টি মোবাইল সেট, একটি দা ও চাপাতি, পাঁটি লাঠি ও একটি রশি উদ্ধার করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার পান্ডরাইল গ্রামের খোরশেদ আলীর ছেলে সবুজ মিয়া (৪৫), ময়মনসিংহের দুবাউড়া থানার গোস্তাবহলী গ্রামের ফজর আলীর ছেলে সুমন মিয়া ((২৮), একই জেলার গৌরিপুর থানার পাঁচকাহানিয়া গ্রামের হারুন-অর-রশিদের ছেলে শামীম (২০), বি-বাড়ীয়া বিজয়নগর থানার চাঁনপুর গ্রামের আবু জাহেদের ছেলে এমদাদুল হক মিলন (২৭), একই জেলার নাসিরনগর থানার তারাউল্লাহ গ্রামের আকবর হোসেনের ছেলে শিপন (২৪), বি-বাড়ীয়া সদর থানার শিলাউর গ্রামের আবিদ মিয়ার ছেলে আজিজুল ইসলাম (২০), সুনামগঞ্জের দুয়ারা বাজার থানার রামপুর গ্রামের জুনাব আলী মিয়ার ছেলে বশির আহমেদ (৩৫) ও চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার ভাটিয়ানপুর গ্রামের মাসুদুর রহমানের ছেলে তানভীর (২১)।

পরবর্তীতে ওই ডাকাতির মামলায় আরো তিন জনকে গ্রেপ্তার করে ২ জানুয়ারি আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) একেএম মিজানুল হক বলেন, ডাকাতি প্রতিরোধে রাত্রিকালীন টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাতে থানা এলাকায় পুলিশের সাতটি টিম ডাকাতি প্রতিরোধসহ বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়াও সাওরাইদ বাজারে হওয়া ডাকাতির ঘটনায় আলামত জব্দ করাসহ ডাকাত চক্রের সদস্যদের পরিচয় সনাক্ত করা হয়েছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।