গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদে নতুন জামাকাপড় কিনে দেবার বায়না ধরেছিল ছেলেরা। কিন্তু গাজীপুর সিটি করপোশেনর নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বলেছিলেন দেশে করোনাভাইরাসের সংকটকাল চলছে। অনেক মানুষ কষ্টে আছে, অনেকের জামাকাপড় নাই। তাই তাদেরকে কষ্টে রেখে তিনি ঈদ আনন্দ করতে চান না। কথা দিয়েছিলেন করোনাকাল শেষ হলেই ছেলেদের নিয়ে শপিং যাবেন, কিনে দিবেন পছন্দসই কাপড়।
গত ১১ মে রাজধানী মিরপুরের বাসা থেকে কর্মস্থলে যাবার সময় নিখোঁজ হন তিনি। পরে ওইদিনই বিকেল তিনটার দিকে উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরের একটি খালি প্লট থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে নিহত প্রকৌশলীর স্ত্রী খোদেজা আক্তার বাদী তুরাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, নিহত প্রকৌশলী দেলোয়ার ও সহকারী প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সেলিম সহকর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অন্তন্দ্বন্দ্ব ছিল। বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তাদের মধ্যে বনিবনা হতো না। হত্যাকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে শাহীন ও মাইক্রো চালক হাবিবকে সঙ্গে নেন সেলিম। ঘটনার দিন সেলিম ও তার অন্য দুই সহযোগী মাইক্রোবাস নিয়ে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে গাড়িতে উঠান। গাড়িটি রূপনগর বেড়িবাঁধে পৌঁছালে সেলিমের ইশারায় মাইক্রোর পেছনে থাকা শাহীন দেলোয়ারের গলায় রশি দিয়ে পেঁচিয়ে টান দেন। পরে সেলিম তাকে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। হত্যার পর দেলোয়ারের লাশটি ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় দেলোয়ারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি দিয়াবাড়ির তিন নম্বর ব্রিজের সামনের লেকে ফেলে দেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত শাহীন ও হাবিব আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, তদন্ত অব্যাহত আছে, অন্য কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দেলোয়ার হোসেন স্ত্রী খোদেজা আক্তারকে বিয়ে করেছিলেন ১৯৯৭ সালে। হাঁটি হাটি পা পা করে বিয়ের ২৩ বছর পার হয়েছে ইতিমধ্যে। মাঝে কোনো একদিন ফেসবুকের পাতায় কোনো এক ’যুগলকে’ ধুমধাম করে বিয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করতে দেখেন তিনি। সেই থেকে স্ত্রী খোদেজাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন ৫০ বছর পাড়ি দেবার। কথা ছিল ৫০ বছর পূর্তিতেও তারাও ধুমধাম আয়োজন করবেন। পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাবেন দূরে কোথাও। সেই থেকে স্ত্রীর অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকে।
কিন্তু যাকে নিয়ে এই এত উপলক্ষ- সেই দেলোয়ার হোসেনই ফিরবেন না আর কখনো। মর্মান্তিকভাবে হত্যার শিকার হয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে তিনি এখন কেবলই ছবি। পুরো পরিবারে বিষাদের ছায়া।
মৃত্যুর আগে গত ২৮ফেব্রুয়ারি নিজের ফেসুবক আইডিতে একটি স্ট্যাটস দিয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন। সেখানে লিখেছিলেন – ’আমার দুটো ভালো লাগার জায়গা আছে, যেখানে আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি। এর মধ্যে একটি বুয়েট ক্যাম্পাস, অন্যটি বাংলা একাডেমি। আজকে দ্বিতীয়টিতে এসেছি।’ স্ট্যাটাসের সঙ্গে জুরে যুক্ত করেছিলেন পুরো পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরির কিছু আনন্দঘন মূহুর্তের ছবি। স্ত্রী ও ছেলারা সেই ছবিগুলো দেখে এখন আবেগ আপ্লুত হন। কান্নায় ভেঙে পড়েন বারবার।
প্রতিবেদক মুঠোফোনে যোগাযাগ করতেই খোদেজা আক্তার বলছিলেন, ’ আমার ছেলেগুলোর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ছোট ছেলাটা (তমাল) বারবার বাবার কথা মনে করে কান্না করছে। তাকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিনা, আমার পুরো পরিবার নিঃশ্বাস হয়ে গেল’।
শুধু কি দেলোয়ার হোসেনের পরিবারে বিষাদের ছায়া! সমান দুঃখে ব্যাতিথ হয়েছেন তার এক সময়কার সহপাঠী, বন্ধু ও সহকর্মীরাও। স্ত্রী খোঁদেজা বলছিলেন, দেলোয়ার হোসেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভিন্ন সময় চাকরি করেছেন ভোলা, চৌমুহনী, নারায়নগঞ্জ ও সর্বশেষ গাজীপুরে। এর মধ্যে হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর খবর কেউ মেনে নিতে পারছেন না। অনেকেই ফোন করে সমবেদনা জানাচ্ছেন, দুঃখ প্রকাশ করছেন।
খোঁদেজা আক্তার বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছে। আমার স্বামীর জন্য তারাও দুঃখ পাচ্ছে। আমি আমার স্বামী হত্যার প্রকৃত বিচার চাই।
দেলোয়ার হোসেনের তিন ছেলে। বড় ছেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় ছেলে একটি কলেজ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে আর ছোট ছেলে পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেনীতে।
বাবার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বড় ছেলে মাসফিকুর সালেহীন হিমেল বলছিলেন, একেতো করোনার ভয়, তার উপর বাবাকে হারালাম। এর চেয়ে বড় কষ্টের আর কি হতে পারে। বাবার জন্য পরিবারের সবাই ভেঙে পড়েছে।
আরো জানতে……
গাজীপুর সিটির প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যা : ২ জনের দায় স্বীকার, সহকর্মী রিমান্ডে
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী হত্যার দ্রুত বিচারের দাবি আইইবি’র