আমাদের মধ্যকার বিতর্ক-বিরোধ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়: প্রধানমন্ত্রী

আমাদের মধ্যকার বিতর্ক-বিরোধ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়: প্রধানমন্ত্রী

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র কিন্তু এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের স্বার্থে আমাদের সবার সতর্ক থাকা জরুরি।’ ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা’, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এমন উক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের মত-পথ ভিন্ন হতে পারে, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক-বিরোধ থাকতে পারে, তবে আমাদের মধ্যকার বিতর্ক-বিরোধ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়।’

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ বছর ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ এর জন্য মনোনীতদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের জন্ম-যুদ্ধে বীর শহিদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের আত্মত্যাগে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, সেই সব আহত, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের সাহসী ভূমিকা এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের জন্য প্রেরণা।’ 

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ– এভাবে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।’

বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবময় ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এটি দেশের সবচেয়ে গৌরবজনক রাষ্ট্রীয় সম্মান। স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা দেশ এবং জনগণের জন্য স্মরণীয় অবদান রেখেছেন কিংবা রাখবেন, তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রবর্তন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব জাতীয় নেতার অবদানকে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি হীন দলীয় স্বার্থে আমাদের ইতিহাসের জাতীয় নেতাদের ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে কার্পণ্য করি, তাহলে ভবিষ্যতের ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। আমি বিশ্বাস করি, ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিতে দ্বিধাচিত্ত থাকা হীনম্মন্যতার পরিচায়ক।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনপ্রশাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং অন্য কোনো ক্ষেত্রেও যারা গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন– এমন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে প্রতিবছর দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। 

তিনি আরও বলেন, চলতি বছর নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক এবং পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও নারী শিক্ষাসহ দেশগঠনে অসামান্য অবদানের জন্য আমার মরহুমা মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এ বছর মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। 

স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত সব গুণীজন এবং প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক অভিনন্দন এবং মোবারকবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ এবং জনগণের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপনাদের এই অবিস্মরণীয় অবদান বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবে। আজ এবং আগামীর বাংলাদেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আপনাদের এসব অবদান প্রেরণার উৎস হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে আপনাদের অবদান এবং সফল কর্মগুলো অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব দরবারেও সমাদৃত হবে।’

তিনি বলেন, ‘অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। সেই বাংলাদেশটি এখন ৫৫ বছর পার করে ফেলেছে। এত বছরে আমাদের যেমন অনেক প্রাপ্তি রয়েছে, অপ্রাপ্তিও কম নয়। সুতরাং আমাদের প্রত্যাশিত স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা কিংবা আর অযথা বিতর্ক নয়।’ 

সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি, দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে শান্তি, নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।’ 

প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করা জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে এক বড়সংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করাই এই মুহূর্তের এক বড় চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেন, শুধু অর্থনীতিই নয়, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও বিপর্যয় নেমে এসেছিল। ইন্টেরিম সরকারের সময়ও শিক্ষাব্যবস্থায় দুঃখজনকভাবে শৃঙ্খলা ফেরেনি। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক এবং কর্মমুখী করতেই হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার কাজটিও আমরা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। 

নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে অর্ধেকের বেশি নারী। নারীদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের কোনো উদ্যোগই সহজে সফল হবে না। এভাবে প্রতি সেক্টরকে চিহ্নিত করে সরকার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার আগেই আমরা বিস্তারিতভাবে দেশের জনগণের সামনে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছিলাম। রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষর করেছিলাম। জনগণ আমাদের প্রতিটি অঙ্গীকারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এবার জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পালা। আমরা ইতোমধ্যেই জনগণের সামনে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছি। আমরা দলীয় ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ। 

বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার সব কিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও জনদুর্ভোগ বিবেচনায় বর্তমান সরকার দাম বাড়ায়নি। এই খাতে প্রতিদিন শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।

বক্তব্য শেষে পুরস্কারপ্রাপ্তদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এদিকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের নিজ দপ্তর থেকে হেঁটে ওসমানী মিলনায়তনে যান। এ সময় রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। বেলা ৩টা ৫৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান, ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বেজে ওঠে জাতীয় সংগীত। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানান। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন হাফেজ কারী হাবিবুর রহমান। এরপর একে একে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান এবং খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।

সূত্র: বাসস