গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : করোনাকালে ঢাকাবাসীর কাছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল এখন নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, গত তিন মাসে প্রকৃত বিলের চেয়ে সাত-আট গুণ বেশি বিল করা হয়েছে।
এই বিল সংশোধন না করে তা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিল না দিলে ৩০ জুনের পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
করোনার কারণে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের বিদ্যুৎ বিল দেয়া হয়েছে অনুমান করে। মিটার রিডাররা সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিল করেননি। সরকার অবশ্য এই তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল ঠিক সময়ে পরিশোধ না করার জরিমানা মওকুফ করেছে।
ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করেন, ফেব্রুয়ারি মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল এক হাজার ৫৪ টাকা। কিন্তু পরের তিন মাসে এক সঙ্গে তার বিল দেয়া হয়েছে ১৬ হাজার ১০০ টাকা। প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘‘অতীতে কখনোই এরকম বিল আসেনি। অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছিনা। পরে ঠিক করে দেয়ার কথা বলছে।”
এরকম অভিযোগ আরো শত শত গ্রাহকের। তারা এখন প্রতিদিন অভিযোগ নিয়ে এই করোনার মধ্যেও বিদ্যুৎ অফিসে ভিড় করছেন৷ কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছেন না।
নেপথ্যে কী?
অনুসন্ধানে বিদ্যুৎ বিলের এই ভেলকিবাজির আপাতত তিনটি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে।
১. মার্চ মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়া
২. বছর শেষে রাজস্ব আদায়ের হিসাব মেলাতে বিল বেশি দেখানো এবং
৩. বিদ্যুৎ বিলের ধাপ (শ্লট) ভিত্তিক হিসাব৷
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের কাহিনি বুঝতে হলে আবাসিক বিদ্যুৎ বিলের হিসেব কীভাবে হয়, তা আগে বুঝতে হবে৷ ১ মার্চ থেকে বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সবশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিলের সর্বনিম্ন স্তরের নাম হচ্ছে লাইফ লাইন। এই লাইফ লাইন ৫০ ইউনিট পর্যন্ত৷ প্রতি ইউনিটের দাম এখন ৩.৭৫ টাকা।
মার্চ থেকে বিদ্যুতের দাম ৫ থেকে ১০ ভাগ বেড়েছে। যেমন আগে লাইফ লাইনের প্রতি ইউনিটের দাম ছিলো ৩.৫০ টাকা। প্রতিটি ধাপেই এভাবে কম বেশি বেড়েছে। এখন আবাসিক বিদ্যুতের দাম-
প্রথম ধাপ: ০-৭৫ ইউনিট- ৪.১৯ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ৭৬-২০০ ইউনিট- ৫.৭২ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ২০০-৩০০ ইউনিট-৬.০০ টাকা
চতুর্থ ধাপ: ৩০১-৪০০ ইউনিট- ৬.৩৪ টাকা
পঞ্চম ধাপ: ৪০১-৬০০ ইউনিট- ৯.৯৪ টাকা
ষষ্ঠ ধাপ: ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে- ১১.৪৮ টাকা
বিদ্যুতের লাইফ লাইন সুবিধা পেতে হলে নির্ধারিত ৫০ ইউনিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু এর বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম প্রথম ধাপ ৪.১৯ টাকা হিসেবেই দিতে হবে।
এরপর বিদ্যুৎ বিলের হিসাব করা হয় ধাপ অনুযায়ী। কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলো সেভাবে ধাপগুলো নির্ধারণ করে বিদ্যুতের বিল হিসাব করা হয়। এর সঙ্গে আরো কিছু চার্জ যুক্ত হয়।
এবার মার্চ, এপ্রিল এবং মে এই তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল একসঙ্গে দেয়া হয়েছে। আর তাও দেয়া হয়েছে অনুমান করে। মিটার রিডিং না দেখে।
তবুও ধরে নিই, একজন গ্রাহক মাসে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। মাসে মাসে তিনি বিল পেলে তার বিল হতো প্রতি ইউনিট ৪.১৯ টাকা হিসেবে। কিন্তু এবার তিন মাসে তাকে একসঙ্গে বিল দেয়া হয়েছে ২২৫ ইউনিটের। তাহলে তার প্রথম ধাপ ৭৫ ইউনিটের বিল হয়েছে ৪.১৯ টাকা হিসেবে। দ্বিতীয় ধাপ ৭৬-২০০ ইউনিটের বিল হয়েছে ৫.৭২ টাকা হিসেবে, আর ওই গ্রাহকের তৃতীয় ধাপ ২০০-৩০০ ইউনিট-এ ২৫ ইউনিটের বিল হয়েছে ৬.০০ টাকা হিসেবে।
যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করছে, তারা একসঙ্গে তিন মাসের বিল করলেও তা গড় করে প্রতিমাসের ধাপ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু গ্রাহকদের বিলে সেই ধাপ উল্লেখ করা নেই। আর তারা লিখিত অভিযোগ করলেও তাদের ধাপ অনুযায়ী বিল দেখানো হচ্ছেনা।
এর সঙ্গে বছর শেষে রাজস্বের হিসেব মেলানোর জন্য অতিরিক্ত আরো ১০-১৫ ভাগ বাড়তি বিল করা হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিইআরসিকে দেয়া চিঠিতে গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল যৌক্তিক পরিমাণের চেয়ে সর্বোচ্চ ১০ গুণ বা এক হাজার ভাগ বেশি আসার অভিযোগ করেছে।
বিতরণ কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বা ডিপিডিসির জেনারেল ম্যানেজার রবিউল হুসাইনের দেয়া তথ্যমতে, করোনার কারণে মার্চ, এপ্রিল ও মে এই তিনমাসের বিল একসঙ্গে করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির বিল ঠিক ছিলো। তাই মার্চের প্রথম তারিখ এবং মে মাসের শেষ তারিখের রিডিং নিয়ে তিন মাসের মোট বিল একসঙ্গে করা হয়েছে।
তাহলে সাত-আট গুণ বেশি বিল কীভাবে হয়? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘‘তিন মাসের বিল একসাথে পাওয়ায় গ্রাহকের কাছে বেশি মনে হচ্ছে৷ এছাড়া এই সময়ে গরমের কারণে গ্রাহকরা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। আর মার্চ মাস থেকে যে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে এটা গ্রাহকের মাথায় নেই।”
কিন্তু তার এইসব ‘যুক্তিতে’ সাত-আট গুণ বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়ার যুক্তি মানতে পারছেন না গ্রাহকরা। কারণ তাদের কাছে গত বছরের একই সময়ের বিদ্যুৎ বিল আছে৷ তারা তা মিলিয়ে দেখে অভিযোগ করছেন। তাদের দাবি, বিদ্যুতের বিল ১০ ভাগ বাড়ার হিসেব ধরলেও এখনকার বিল প্রকৃত হিসেবের চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি।
তবে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বিদ্যুৎ বিলের ত্রুটির কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি দাবি করেন, ‘‘তিন মাসের বিলের ধাপ একসঙ্গে নির্ধারণ করা হয়নি৷ গড় করে প্রতিমাসের বিলে ধাপ আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।”
অবশ্য বিলে কিছু ভুল আছে এবং তা সংশোধন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিকাশ দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘‘ওভার এবং আন্ডার বিলিং, দুই ধরনের ঘটনাই ঘটেছে৷ যোগ, বিয়োগ করতেও কিছু ভুল হয়েছে।”
তারপরও এত গ্রাহকের সাত-আট গুণ বিল বেশি কীভাবে আসে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এই দুইজন কর্মকর্তা রাজস্ব আদায়ের হিসাব মেলাতে বিদ্যুৎ বিল কিছু বেশি করার অভিযোগও অস্বীকার করেন।
বিল বাতিলের দাবি
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রকৌশলী শামসুল আলম বলেন, ‘‘তিন মাসের বিল একসঙ্গে করা বেআইনি। আর এই বিল একসঙ্গে করার ভিতরেই আছে অনেক জটিলতা। মনগড়া বিল করা হয়েছে। আমরা মনে করি মাসের বিল মাসে দিতে হবে। মনগড়া বিল দিলে চলবেনা। আমরা এই বিল বাতিলের দাবি জানিয়েছি। প্রতি মাসের বিল প্রতি মাসে দেয়ার দাবি করেছি।”
সূত্র: ডয়চে ভেলে