গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঈদুল আজহার আগ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। বিপত্তির শুরু ঈদের ছুটির পর। রাস্তায় বাড়তি মানুষের সুযোগ নিয়ে পাবলিক বাসে অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে শুরু করেন বাস মালিকরা। যেখানে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চালানোর কথা, সেখানে দাঁড়ানো যাত্রীও তোলা শুরু হয়। দিন যত যাচ্ছে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে এ প্রবণতা ততই বাড়ছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে বাস মালিকদের এক দফা চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে বিআরটিএর নির্দেশ-অনুরোধের কোনো তোয়াক্কাই করছেন না পরিবহন মালিকরা।
নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব ধরনের গণপরিবহনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনা দেয় সরকার। ১ জুন যখন সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়, তখন থেকেই এ নির্দেশনা কার্যকর হয়। দুই মাস পেরোতে না পেরোতেই সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। মালিকদের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে বাস পরিচালনার অনুরোধ শুধু বিআরটিএ নয়, খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও একই অনুরোধ জানিয়েছেন। বিআরটিএ বা সেতু বা সেতুমন্ত্রী কারো কথাই শুনছেন না পরিবহন মালিকরা। অবশ্য তাদের যুক্তি, যাত্রীরা নিজ তাগিদেই বাসে উঠছেন। কোনো যাত্রীকে জোর করে বাসে ওঠানো হচ্ছে না। অন্যদিকে একাধিকবার সরকারের নির্দেশনা প্রতিপালনের অনুরোধ জানিয়েও যখন বিআরটিএ বাস মালিকদের সঙ্গে পেরে উঠছে না, তখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসেবে ঢাকায় চলাচলরত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা কম-বেশি পাঁচ হাজার। পরিবহন মালিকদের দাবি, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে ৬০-৭০ শতাংশ বাস অলস বসে আছে। তবে বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় যতসংখ্যক বাস চলছে, তাতে মালিকদের এ দাবির সত্যতা মিলছে না।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ৮ থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঢাকার পাবলিক বাসগুলোতে ভিড় বেশি হচ্ছে। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত যাত্রী সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। বেলা ৩টার পর থেকে ফের বাড়ছে ভিড়। ভিড়ের সময়টাতে কোনো বাসই অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখছে না। বরং আগের মতোই চলছে যাত্রী তোলার প্রবণতা। বাসে কোনো যাত্রী উঠলে পরিবহন শ্রমিকরা ‘দেশে নভেল করোনাভাইরাস নেই’ বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। আবার যাত্রীর তুলনায় গণপরিবহনের সংখ্যা কম হওয়ায় যাত্রীরাও যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যদিও তাদের গুনতে হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সরকার অনুমোদিত বর্ধিত ভাড়া।
ঢাকার বাইরেও একই চিত্রের খবর দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা। তারা জানিয়েছেন, গণপরিবহনে আর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে না। মালিক-শ্রমিকরা বাসে ইচ্ছামতো যাত্রী তুলছেন। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
দেশের সড়ক পরিবহন খাতের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি।
স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ও এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ তার দায় যাত্রীদের ওপরই চাপাচ্ছেন। তিনি এ বিষয়ে বলেন, শুরু থেকেই আমরা সরকারের নির্দেশনা মেনে বাস পরিচালনা করে আসছি। প্রথম দুই মাস বলতে গেলে আমাদের ফাঁকা বাস চালাতে হয়েছে। যাত্রীদের সেবা দেয়ার স্বার্থে তার পরও আমরা ট্রিপ অব্যাহত রেখেছি। এখনো স্বাস্থ্যবিধি মেনেই বাস চালানো হচ্ছে।
তবে পরিবহন শ্রমিকরা স্বীকার করছেন মাঝে-মধ্যে বাসে অতিরিক্ত যাত্রী উঠছেন। এর দায় তারা যাত্রীদেরই দিচ্ছেন। তাদের দাবি, মাঝে-মধ্যে বাসে একসঙ্গে অনেক বেশি যাত্রী উঠে যাচ্ছেন। তখন আর বাসের অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রথমে সরকারের নির্দেশ ও পরে সেই নির্দেশ পালনের জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় বিআরটিএ। ঢাকার আটজন ও চট্টগ্রামে তিনজন ম্যাজিস্ট্রেটকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালসহ রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট এবং চট্টগ্রামের সব বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনগুলোকেও বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে দেশের পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তার পরও ঢাকাসহ সারা দেশে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, সর্বশেষ মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণপরিবহনে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি, কোনো কোনো গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো প্রতিপালন করা হচ্ছে না। আমরা বিষয়টি বাস মালিক-শ্রমিকদের অবহিত করেছি। এখন থেকে আমরা কঠোর অবস্থানে যাব। এরই মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রেটরা সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করবেন। এর বাইরে জেলা প্রশাসনগুলোকেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত গণপরিবহনে যেন স্বাস্থ্যবিধি বজায় থাকে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
সূত্র: বণিক বার্তা