গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : লকডাউনে প্রায় দেড় কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এর আওতায় আসবেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের ক্ষুধা দূর করা না গেলে ভয় দেখিয়ে লকডাউন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সলিম উদ্দিন সামাদ (৩৮) কাজ করেন রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে। দুই মেয়ে, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে তার টানাটানির সংসার চলে প্রতিদিনের রোজগার দিয়ে। গত বছরের মার্চে করোনা শুরুর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার নির্মাণকাজ শুরু হলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আবার ‘কঠোর লকডাউনের’ ঘোষণায় সামাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।
রোববার দুপুরে সামাদ বলছিলেন, ‘‘গেল বছরের ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারিনি। আত্মীয় আর মালিকের কাছ থেকে যে ধার করেছিলাম সেটা এখনও শোধ হয়নি। এখন আবার সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হলে কীভাবে চলব? ভোলার চরফ্যাশন থেকে ঢাকায় এসেছি। গ্রামের বাড়ি বলতেও কিছু নেই। নদীগর্ভে চলে গেছে বাড়িঘর।’’ কোন সহায়তা পেয়েছেন কীনা এমন প্রশ্নে বলেন, ‘‘আমি যে বিল্ডিংয়ে কাজ করি সেটার মালিক গত বছরের এপ্রিলে ১০ কেজি চাল আর ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন। এর বাইরে কেউ একটি পয়সাও দেয়নি।’’ সামনের দিনগুলো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এখন সামাদ।
শুধু সামাদ নন, এমন অসংখ্য মানুষ ‘কঠোর লকডাউনের’ ঘোষণায় দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে খাবার জুটবে সেটা নিয়েই রাজ্যের চিন্তা তাদের। খাদ্যের নিশ্চয়তা না দিয়ে কি মানুষকে ঘরে বন্দি রাখা যাবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনভাবেই সম্ভব নয়৷ করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগে, না খেয়ে মরতে চাইবে না কেউ। ফলে এই লোকগুলো বের হবেই৷ তাদের ঘরে রাখতে গেলে আগে খাবার পৌঁছাতে হবে।
তবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘‘বাংলাদেশে এখন তো আর কেউ না খেয়ে মারা যায় না। আমরা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে কমিটি করেছি। তাদের মাধ্যমে যারা দারিদ্রসীমার নিচে আছেন তাদের ২০ কেজি চালসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র ও পাঁচ-সাতশো টাকাও পৌঁছে দেওয়া হবে। সবার তো এই সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আড়াই লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে ৩৬ লাখ টাকা করে পৌঁছে দিয়েছি। পাশাপাশি চাল-ডালসহ যা যা দেওয়া দরকার তার সবই পাঠানো হয়েছে।’’ প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, গ্রামে এই ব্যবস্থাপনা করা হলেও শহরে সেটা কঠিন। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই ব্যবস্থাপনাটা এখনও করা যায়নি।
২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করেন প্রায় সোয়া তিনি কোটি মানুষ। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে করোনার প্রভাবে নতুন করে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। সমস্যা হল সরকারের কাছে দারিদ্রসীমার নিচে থাকা এই নতুনদের কোন তালিকা নেই। তাই সহায়তা পাবেন পুরনোরাই। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন লকডাউন কার্যকর করতে হলে সব মানুষের কথাই চিন্তা করা প্রয়োজন। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সনাল বলেন, ‘‘মানুষকে ঘরে বন্দি করার আগে তাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সরকারের মন্ত্রীরা যত কথাই বলুন না কেন, সবাইকে খাবার পৌঁছানোর নেটওয়ার্ক এখনও তৈরী হয়নি।’’
এর মধ্যেও সরকার দরিদ্রদের জন্য যে খাদ্য বা অর্থ বিতরণ করে সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। যে কারণে জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে কোন সুফল মিলবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আর্সনাল বলেন, ‘‘কত শতাংশ জনপ্রতিনিধি এই দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে? পারসেনটেজ করলে দেখা যাবে খুবই সামান্য? এলআর ফান্ডসহ তাদের যে খরচের হিসাব সেটা পরীক্ষা করলে দেখা যাবে জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে তাদের দুর্নীতি কয়েক হাজারগুন বেশি। আমরা দেখেছি, কোন সরকার একটু দুর্বল অবস্থানে থাকলে আমলারা তাদের উপর চেপে বসে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এখন কোভিডের এই সময়ে তারা নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটানোর সময় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এখন তো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আমলারা। ফলে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে জনপ্রতিনিধিদের চরিত্র হনন করার সহায়তার মধ্য দিয়ে মানুষের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করার মধ্য দিয়ে তারা তাদের ক্ষমতায়নের জায়গাটা সুসংহত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।’’
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও স্বীকার করেছেন, ৫৮ হাজার জনপ্রতিনিধির মধ্যে একশ’র কিছু বেশি মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তার দাবি অনেক ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাদের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট এসেছে। তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষকে যে অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে সেটা জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে ইউএনওরা বিতরণ করবেন। চাল-ডাল বিতরণসহ অন্য কাজগুলো জনপ্রতিনিধিরা করবেন।
গত রোজার ঈদের আগে ৩৬ লাখ পরিবারকে নগদ আড়াই হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারের লকডাউনে দেশের প্রায় দেড় কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রত্যেক পরিবারকে ২০ কেজি চাল, পাঁচ কেজি ডাল, দুই কেজি পেঁয়াজ, এক কেজি সয়াবিন তেল, এক কেজি লবণ, পাঁচ কেজি আলু এবং নগদ পাঁচ থেকে সাতশ টাকা দেওয়া হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যে পাঠানো শুরু হয়েছে। তবে এই সাহায্যের আওতার বাইরে থেকে যাবেন নির্মাণ শ্রমিক সামাদের মতো অনেকেই, যারা সারা বছর দরিদ্র না থাকলেও লকডাউনের কারণে কাজ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে আসেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘সরকার যত কথাই বলুক সবার কাছে খাদ্য সরবরাহের চেইনটা আমাদের দেশে তৈরী হয়নি। এক্ষেত্রে সরকার চাইলেই প্রতিটি ওয়ার্ডে নানা শ্রেণী পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে কমিটি করতে পারে। শুধু সরকারের দিকে চেয়ে থাকলেই হবে না, অন্যান্য মানুষ যাদের সামর্থ্য আছে তাদেরকে সামনে আনতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়া সব দরিদ্র মানুষের কাছে খাবার পৌঁছানো যাবে না। আর এটা না পারলে কোনভাবেই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে না। যার পেটে ক্ষুধা সে খাবার না পেলে বাস্তায় বের হবেই। কোন ভয় দেখিয়েই তাকে আটকে রাখা যাবে না। এখন আমাদের দেশে যেভাবে সংক্রমন বাড়ছে তাতে সর্বাত্মক এই লকডাউনটাও জরুরি। সরকারকে পুরো সাপ্লাই চেইনটা তৈরী করেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে।’’
সূত্র: ডয়চে ভেলে