ইন্সপেক্টর সোহেল রানাকে কেন পুলিশ ধরেনি?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ই-অরেঞ্জের হোতা বনানী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সোহেল রানা ভারতে বিএসএফ-এর হাতে ধরা পড়লো। কিন্তু বনানী বা গুলশান থানা তাকে কেন ধরেনি? প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশই কি তাহলে তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে?

ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একজন গ্রাহক তাহেরুল ইসলাম আদালতে মামলা করেন গত ১৭ আগস্ট৷ অন্য আসামিরা হলেন, ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, আমানউল্লাহ, বিথী আক্তার ও কাউসার আহমেদ। এরপর ৩১ আগস্ট ইশতিয়াক হোসেন টিটু নামে আরেকজন ভুক্তভোগী সোহেল রানাসহ ই-অরেঞ্জের ১০ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন।

১৮ আগস্ট আদালত তাহেরুল ইসলামের মামলার ছয় আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই মামলায় এরই মধ্যে সোনিয়া মেহজাবিন, মাসুকুর রহমান ও আমানুল্লাহকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গুলশান থানায় করা এ মামলায় তাদের আটক করা হলেও ইন্সপেক্টর সোহেল মুক্তই থাকেন। তার কর্মস্থল বানানী থানায় তিনি গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিয়মিত ডিউটি করেছেন। এমনকি এই সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি।

মামলা ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইন্সপেক্টর সোহেল রানা কমপক্ষে ১৬ দিন তার কর্মস্থলে থেকে নিয়মিত ডিউটি করেছেন। এরপর কোনো ছুটি না নিয়েই বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে ভারত নেপাল সীমান্ত থেকে আটক করে ৩ সেপ্টেম্বর।

সেখানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে রোববার সাসপেন্ড করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সেটাও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নয়, অবৈধভাবে দেশত্যাগের প্রমাণ পাওয়ায়। আর এখন পুলিশ বলছে তাকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু যতই দ্রুত ফেরত আনার কথা বলা হোক না কেন ভারতে তার মামলা নিস্পত্তি এবং সাজা হলে তা ভোগ করার আগ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই।

ইন্সপেক্টর সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার না করার পক্ষে এখন নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। ইন্সপেক্টর সোহেল রানার চাকরি ছিলো বনানী থানায়। আর মামলা হয়েছে গুলশান থানায়। এই দুইটি থানা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের অধীন।

ওই বিভাগের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বনানী থানায় ডিউটি করেছেন ইন্সপেক্টর সোহেল রানা। তিনি যে পালিয়ে যাবেন তা আমরা বুঝব কীভাবে।”

মামলা ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সে পালালো কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘সে তো বৈধভাবে যায়নি। বৈধভাবে গেলে তো আমরা আটকাতে পারতাম। অবৈধভাবে গিয়েছে বলেই তো তাকে বিএসএফ আটক করেছে।”

তাকে তাহলে আগেই গ্রেপ্তার বা বিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় কেন আনা হলো না? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘মামলার তদন্ত চলছে। সে একজন সরকারি কর্মকর্তা। তাকে গ্রেপ্তার করার কিছু নিয়ম আছে। নিয়মের বাইরে তো আমরা কিছু করতে পারি না। আর মামলার তদন্ত চলাকালে তো আমরা কাউকে অপরাধী বলতে পারি না।”

তিনি জানান, সোহেল রানা বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত অফিস করে শুক্রবার পালিয়ে যায়। আর মামলা হয়েছে বৃহস্পতিবার রাতে। আগের মামলাগুলোর এজাহারে তার নাম ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

গুলশান থানার ওসি মো. আবুল হাসান দাবি করেন, ‘‘মামলার তদন্ত চলছিল৷ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কিছু করার ছিল না। তবে ২ অক্টোবর রাতে একটি মামলা হয় থানায়। সেই মামলায় তাকে আসামি করা হয়। ওই মামলার খবর পেয়েই তিনি রাতে থানা থেকে পালিয়ে যান।”

রানার পালিয়ে যাওয়া মামলা ও গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।”

ই-অরেঞ্জের কাছে সাড়ে আট লাখ টাকা প্রতারণার শিকার একজন মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘‘আমরা শুরুতেই গুলশান থানায় মামলা করতে গেলে ওসি সাহেব মামলাই নিতে চাননি। পরে মাশরাফি ভাই ফোন করায় মামলা নেওয়া হয় তবে ইন্সপেক্টর সোহেল রানার নাম বাদ দিয়ে। তবে তিনি পালানোর আগে ৩১ আগস্ট তাকে আসামি করে আরেকটি মামলা করি।”

পুলিশের সাবেক এআইজি সৈয়দ বজলুল করিম মনে করেন কিছু পুলিশ সদস্যের সহায়তায়ই ইন্সপেক্টর সোহেল রানা পালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘এখানে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। পুলিশের একজন ইন্সপেক্টর জড়িত এটা কেউ জানত না সেটা অসম্ভব। এখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায় আছে, তারা মনিটরিং-এ ব্যর্থ হয়েছেন। তার সাথে আরো কেউ কেউ জড়িত আছে। তারাই তাকে পালাতে সহায়তা করেছেন।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button