কেরোসিন ও ডিজেলের দাম বাড়ল লিটারে ১৫ টাকা!
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে জ্বালানি পণ্যের। সব বাজার আদর্শেই ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য। এ প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারেও দাম বেড়েছে ডিজেল ও কেরোসিনের। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
নতুন ঘোষণায় দেশের বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য ধরা হয়েছে ৮০ টাকা করে। প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত ছিল জ্বালানি পণ্য দুটির মূল্য। ২০১৬cসালের এক ঘোষণায় জ্বালানি পণ্য দুটির দাম কমিয়ে লিটারপ্রতি ৬৫ টাকা করে নির্ধারণ করেছিল সরকার। সে হিসাবে দেশে কেরোসিন ও ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ১৫ টাকা করে।
জ্বালানি পণ্য দুটির মূল্যবৃদ্ধি দেশের পরিবহন ও কৃষি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে একদিকে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়বে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে যাচ্ছে কৃষি খাতে। একই সঙ্গে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধিসহ সার্বিকভাবে গোটা অর্থনীতিতেই এর বহুমুখী চাপ অনুভূত হতে যাচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের ভাষ্য হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যাপক হারে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠায় দেশের বাজারে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম না বাড়ালে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো যাচ্ছিল না।
দেশে জ্বালানি তেলের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত আমদানিকারক সংস্থা বিপিসি। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটি জ্বালানি তেল আমদানি করে বিপণন করে আসছে। সংস্থাটি বলছে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যে সমন্বয় করতে দাম বাড়ানো হয়েছে। এটি না করলে বিপিসির দৈনিক লোকসান হচ্ছিল ২০ কোটি টাকার বেশি।
এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ বলেন, দেশের বাজারে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বাড়িয়ে সরকার মূলত জ্বালানি পণ্য দুটির দাম সমন্বয় করেছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির লোকসান কমাতে সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে এলে সরকার পরে দেশেও ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যহ্রাসের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশ জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়মিতভাবে সমন্বয় করছে। এ প্রসঙ্গে ভারতে ডিজেলের বাজারদর উল্লেখ করে জ্বালানি বিভাগ বলছে, চলতি বছরের ১ নভেম্বর ভারতে ডিজেলের প্রতি লিটারের দাম ছিল ১২৪ টাকা ৪১ পয়সার সমপরিমাণ (১০১ দশমিক ৫৬ রুপি)। এর বিপরীতে বাংলাদেশে ডিজেলের মূল্য ছিল লিটারপ্রতি ৬৫ টাকা। অর্থাৎ নতুন করে দাম সমন্বয়ের আগে ভারতে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ৫৯ টাকা ৪১ পয়সা বেশিতে।
জ্বালানি বিভাগ-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বিপিসি দেশের বাজারে ডিজেলে লিটারপ্রতি ১৩ টাকা ১ পয়সা ও ফার্নেস অয়েলে লিটারপ্রতি ৬ টাকা ২১ পয়সা করে লোকসান দিচ্ছিল। বিপিসি দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার ৮০০ টন ডিজেল ও দুই হাজার টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি করে। সে হিসাবে সংস্থাটির দৈনিক মোট লোকসান হচ্ছিল প্রায় ২০ কোটি টাকা করে। গত মাসেও বিভিন্ন গ্রেডের পেট্রোলিয়াম পণ্য আগের দাম অনুযায়ী সরবরাহ করায় ৭২৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে সংস্থাটির।
কভিড মহামারীর প্রভাবে গত বছরের অক্টোবর থেকে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পড়তে থাকে। ওই সময় পণ্যটির মূল্য নেমে আসে ব্যারেলপ্রতি ৪০-৪২ ডলারে। ধারণা করা হয়েছিল, পরে পণ্যটির দাম আরো পড়ে যাবে। যদিও বিশ্বব্যাপী করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর পণ্যটির মূল্যসূচকে উল্টো গতি দেখা যায়।
অয়েলপ্রাইসডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) বিক্রি হচ্ছে ৮১ ডলার ২১ সেন্টে। আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ ডলার ৩৮ সেন্ট।
অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫৯ ডলার। একইভাবে ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৪৮৭ দশমিক ২১ ডলার।
এদিকে দেশে কেরোসিন ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশে এর ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। বিশ্ববাজারে কী পরিমাণ দাম বেড়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় লিটারপ্রতি ১৫ টাকা দাম বাড়ানো হলো, সেটি বিবেচনা করতে হবে। বিপিসি এতদিন যে মুনাফা করেছে, সেই টাকা কোথায় গেল?
সূত্র: বণিক বার্তা



