সালিম-আনারকলি উপাখ্যান: লোকশ্রুতি এবং ইতিহাসের পরম্পরা

জয়িতা দাস: শাহি খাতিরদারি বলে কথা! আফগান-সুলতান ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি রাখেননি। তাছাড়া খোদ আকবর বাদশা সুলতানের মেহমান। আতিথ্যে যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে, সেদিকে সুলতানের কড়া নজর। তার নির্দেশে রাতদিন বাদশার খিদমতে হাজির কয়েকশ খাদিম।

আকবর খুশ। খুশ আরো অনেক কারণেই। বাদশার সম্মানে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করেছিলেন সুলতান। সে ভোজের রাতে নাচের আসর মাত করে দিয়েছিল এক আফগান সুন্দরী। বাদশা খোঁজখবর নিয়ে জেনেছেন মেয়েটির নাম নাদিরা। আফগানিস্তানের এক হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে। রূপবতী কন্যা। গরিব পিতা তার পেটের দায়ে মেয়েটিকে বিক্রি করে দিয়েছিল আফগান প্রাসাদে। ওস্তাদ নাচিয়ে নাদিরা। সুলতানের দরবারে নর্তকী হিসেবে যোগ দিয়েই সবার মন জয় করে নিয়েছিল। দরবারিরা সব নাদিরা-প্রেমে উন্মাদ।

ঘোর লেগেছিল আকবর বাদশার চোখেও। মেয়ের ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণ্য দেখে। আকবর সে অর্থে কামতাড়িত পুরুষ নন। তবে নারীসঙ্গ খুব পছন্দ ছিল তার। হারেমে সবসময় তাকে ঘিরে থাকত হুরির দল। আসলে সুন্দরী বাঁদি সংগ্রহ করাটা ছিল বাদশার নেশা। তার হারেম সুন্দরীর সংখ্যা তো আর এমনি এমনি পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়নি! তবে পুত্র কিংবা পৌত্রদের মতো কোনোদিন পরস্ত্রীর দিকে নজর দিতে যাননি বাদশা। একবারই শুধু মতিভ্রম হয়েছিল তার। মিনাবাজারে এক রাজপুত রানীকে দেখে কামতাড়িত হয়ে নিজের হুঁশ খুইয়ে বসেছিলেন। তা সেই রাজপুত রমণীও আকবরকে উচিত শিক্ষা দিতে ছাড়েননি। নিজের জামার ভেতর থেকে বের করে এনেছিলেন লুকানো খঞ্জর। না, বাদশাকে আঘাত করার জন্য নয়। নিজের সম্মান বাঁচাতে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন তিনি।

সে অন্য এক গল্প। আপাতত নাদিরার কথা বলি। বাদশা আফগানিস্তানে এলেন, নাদিরাকে দেখলেন, সেই থেকে তিনি ডুবে আছেন নাদিরায়। চোখ বুজলেই তার চোখের সামনে প্রজাপতির মতো নেচে বেড়ায় নাদিরার মুখ। বাদশা অস্থির।

বিচক্ষণ আফগান শাসক ঠিক পড়ে নিয়েছিলেন আকবরের চোখের ভাষা। বিদায়বেলায় বাদশার জন্য ছিল তাই এক নতুন চমক। প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকনের সঙ্গে বাঁদি নাদিরাকেও তিনি উপহার দিয়েছিলেন আকবরকে।

আকবর তৃপ্ত। বাঁদি নাদিরার সঙ্গসুখে। রাজধানীতে ফিরে তার সোহাগী বাঁদির নতুন নামকরণ হলো। আনারদানার মতো টুকটুকে রূপ যার, তাকে কি আর অন্য নাম মানায়? সে থেকে নাদিরা হলেন আনারকলি। তার রূপ, তার লাস্য, তার নাচ-গান—বৃদ্ধ বাদশার সব ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে দেয়। হারানো যৌবন ফিরে পাওয়ার আবেশ ছড়ায় বাদশার মনে।

এদিকে পিতার মহলে শাহজাদা সালিমের নিত্য আনাগোনা। সেখানেই একদিন আনারকলির চোখে চোখ রাখা তার। সালিম মুগ্ধ। তরুণ বয়স থেকেই সালিমের নামের সঙ্গে লেপটে রয়েছে এক দুর্নাম—ইশকজাদা। ইশকের জন্য তার দিল কোরবান। আনারকলির ইশকও উদ্দাম করে তোলে শাহজাদাকে। আত্মহারা শাহজাদা ভুলে গেলেন, এ সুন্দরী তার পিতার বাঁদি।

আশিকের চোখের মুগ্ধতা পড়তে কি আর সময় লাগে! আনারকলি ঠিক বুঝতে পেরেছে সালিমের মনের কথা। তরুণ সালিমে মন মজেছে তারও। শাহজাদার মুখোমুখি হলে রঙিলার মতো বিলোল কটাক্ষ হেনে দ্রুত সরে যায় সে সামনে থেকে। বাদশাজাদা সেই অব্যর্থ নিশানায় উন্মাদ। আনারকলিকে পাওয়ার জন্য সালিম মরিয়া তখন।

মরিয়া আনারকলিও। সালিম-অনুরাগে উচাটন তার মন। ভরা যৌবন তার। প্রৌঢ় বাদশার সঙ্গ কি আর তাকে তৃপ্ত করতে পারে? বাদশা আনারকলির সঙ্গ পেলেই খুশ। তার সুরের জাদুতেই মগ্ন। মগ্ন তার দেহের বিভঙ্গে। আর সালিম? সে যেন ঝড়ের মতো। তার বাঁকা চাউনি মুহূর্তে তছনছ করে দেয় আনারকলির দুনিয়া। সালিমের কামনা-দৃষ্টি দগ্ধ করে তাকে। পিয়া-মিলনের জন্য ব্যাকুল তখন সে। আনারকলি বাধ্য হয় ব্যভিচারিণী হতে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। গোপনে সে মিলিত হয় শাহজাদার সঙ্গে। সেই থেকে একে-অন্যের প্রেমে আকণ্ঠ ডুবে থাকা।

তা এসব কথা কি আর চাপা থাকে? হাওয়ায় উড়তে উড়তে বাদশার কানে একদিন ঠিক পৌঁছে যায় এ খবর। হুরিদের প্রতি পুত্রের দুর্বলতার কথা জানা ছিল বাদশার। তাই বলে সে পিতার হারেমের দিকে নজর দেবে, এ যে অবিশ্বাস্য! ক্রমে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়া গেল, মিথ্যে নয় এ সংবাদ। তবু বাদশা চুপ। বিচক্ষণ আকবরের চাই হাতেনাতে প্রমাণ।

তা একদিন চাক্ষুষ প্রমাণও পাওয়া গেল। সন্দেহ কাটল মনের। নিজের চোখে বাদশা যা দেখেছেন, সে তো আর মিথ্যে হতে পারে না! অতএব, চরম শাস্তি দেয়া হলো বেয়াদব বাঁদিকে। সালিমের চোখের জল, অনুতাপ, ক্ষমা ভিক্ষা—কোনো কিছুই বাদশাকে টলাতে পারেনি। হারেমে ব্যভিচারকে বাড়তে দিলে যে প্রশ্রয় পাবে অন্য কানিজরাও! এমন ফয়সালার প্রয়োজন ছিল তাই। অতএব নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন বাদশা।

আনারকলির কপাল মন্দ। বাদশার শ্যেনদৃষ্টির কথা ভুলে গিয়েছিল সে। প্রৌঢ় বাদশার নজরের জোর কি আর আগের মতো আছে? হয়তো ভেবেছিল সে! তাই অসাবধানী। বাদশাকে নজর আন্দাজ করে যে ভুল করেছিল সে, নিজের জীবন দিয়ে সে ভুলের চরম মূল্য দিতে হয় তাকে।

ঘটনাটি খুলেই বলা যাক। আকবর সেদিন শিসমহলে। বিশ্রাম করছিলেন। পাশে সালিম। এমন সময় আনারকলির আবির্ভাব সেখানে। আনারকলি হাজির হতে সৌজন্যবশত সালিম বেরিয়ে যান কক্ষ ছেড়ে। বুঝতে পারেননি, বাদশার দৃষ্টি অনুসরণ করছে তাকে। আর বাদশা? শিসমহলের দেয়াল-আয়নায় তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, বেরোনোর সময় আনারকলির মুখোমুখি হতেই সালিম পূর্ণ দৃষ্টিতে একবার চোখে চোখ রাখলেন বাদশার বাঁদির দিকে। সে দৃষ্টি পড়তে অসুবিধে হয়নি বাদশার। প্রেমিকের তৃপ্ত অনুরাগের ছোঁয়া ভাষা পেয়েছিল সালিমের চাউনিতে। আনারকলি কটাক্ষে জবাব দিয়েছিল সে দৃষ্টির। উচ্ছল আবেগ আর কামনাভরা সে নজরিয়ার ভাষা বলে দিয়েছিল আনারকলির মনের কথাও।

বাদশা রেগে আগুন। চাক্ষুষ প্রমাণে। সিংহ গর্জনে সেদিন কেঁপে উঠেছিল মোগল হারেম—‘জ্যান্ত কবর দেয়া হোক এই স্বৈরিণীকে’। হুকুম দিলেন বাদশা। এহেন আদেশে স্তব্ধ হয় গোটা রাজধানী। হাহাকার ওঠে। হারেমে, দরবারে, শহরজুড়ে। কিন্তু বাদশার আদেশ টলে না। আর একদিন, লাহোরে, ইরাবতীর বাঁ তীরে, গড়ে তোলা হয় আট দেয়ালের এক সৌধ। নিশ্ছিদ্র এর দেয়াল। সেখানেই জীবন্ত কবর দেয়া হয় আনারকলিকে। প্রেমিক সালিম সেদিন অসহায়ের মতো শুধু তাকিয়ে দেখেছেন তার মাশুকার এ চরম পরিণাম।

এরপর কেটে গেছে হাজার হাজার দিন। শাহজাদা সালিম তখন সম্রাট। হাজারো নারীর সাহচর্যে পূর্ণ তার জীবন। তবু যেন বুকের একটা কোণ বড় ফাঁকা—বড় শূন্য বলে মনে হয় তার। আনারকলির স্মৃতি তখনো কুরে কুরে খায় তার বুকের পাঁজর। বাদশাহী তখতে বসেই তাই প্রিয়তমার সৌধে, এক শ্বেতপাথরের গায়ে লিখে রাখলেন তার মনের কথা। খুব বেশি কিছু নয়, মাত্র দু’ছত্রের এক আরবি বয়েৎ—

‘আর একবার যদি প্রিয়তমার মুখটি দেখতে পেতাম,

তাহলে হে আমার সৃষ্টিকর্তা, মৃত্যুদিন অবধি তোমার প্রশংসা করতাম আমি।’

নিচে নিজের পরিচয়—‘প্রেমকাতর সালিম, আকবর তনয়’

সে থেকে সালিম-আনারকলি, আনারকলি-সালিম—যুগ যুগ ধরে শাহজাদা আর বাঁদির এ প্রেমের আখ্যান মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনে এসেছে। সে লোককথায় অবশ্য আনারকলি সালিমের বাঁদি। আকবরের হারেমের সঙ্গে তার যোগ নেই কোনো।

আর ইতিহাস কী বলছে? অধিকাংশ ঐতিহাসিক বলছেন, এ কাহিনী নিছকই এক লোককথা। সালিম-আনারকলির প্রেমকে বাস্তব বলে মানতে তারা নারাজ। ব্যতিক্রম উইলিয়াম ফিঞ্চ বা এডওয়ার্ড টেরির মতো কয়েকজন। টেরির বক্তব্য, আনারকলি মোটেই বাঁদি ছিল না। আসলে সে ছিল আকবরের বেগম। বেগমের সঙ্গে পুত্রের ঘনিষ্ঠতায় বিরক্ত হয়েছিলেন আকবর। তাই জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সিংহাসনে বসানোর যে প্রাচীন নিয়ম রাজবংশগুলো বরাবর অনুসরণ করে এসেছে, সে নিয়মকে উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি। ঠিক করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর পুত্র নয়, পৌত্র খসরুই হবে এ হিন্দুস্তানের সম্রাট: ‘You notwithstanding that long continued custom there, for the eldest son to succeed the father in that great empire; Achabar-Sha, father of that late King, upon high and just displeasure taken against his son, for climbing up unto the bed of Anarkelee, his father’s most beloved wife, (whose name signified the kernel of a pomegranate) and for other base actions of his. Which stirred up his father’s high displeasure against him, resolved to break that ancient custom; and therefore often in his life-time protested, that not he, but his grand-child, Sultan Coobsurroo, whom he always kept in his court, should succeed him in that empire.’ (A Voyage to East-India by Edward Terry).

শুধু টেরি নন, আরো অনেকেই আনারকলিকে আকবরের বেগম বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, আকবরপুত্র দানিয়েলের আম্মিজানই আসলে কিংবদন্তির আনারকলি। আবার অনেকের বক্তব্য, জাহাঙ্গীর-পত্নী সাহেব-ই-জামালই আসল আনারকলি।

তা সত্যি হোক কিংবা কিংবদন্তি, সালিম-আনারকলির প্রেমকাহিনী কোনো অংশেই রূপকথার গল্পের চেয়ে কম আকর্ষক নয়। যদিও উইলিয়াম ফিঞ্চ বা এডওয়ার্ড টেরি এ আখ্যানকে নিছকই লোকশ্রুতি বলে উড়িয়ে দিতে নারাজ। নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার পেছনে ফিঞ্চের জোরালো যুক্তি—এ গল্প তিনি এমন সব লোকের মুখে শুনেছেন, যারা নিজের হাতে শাহজাদার প্রিয়তমার জন্য সমাধিসৌধ গড়েছিল। গড়েছিল আনারকলির কবর। ফিঞ্চের এ মন্তব্যই বলে দেয়, সালিম-আনারকলি ইশক-উপাখ্যান নিয়ে সেকালেও জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। তাই তো এ কাহিনীকে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি দিতে আদাজল খেয়ে লেগে পড়া।

বেচারা আনারকলি! সালিমকে ভালোবাসার জন্য চরম মূল্য দিতে হয় তাকে। আর এ চরম পরিণতিই তাকে বিখ্যাত করে রেখে গেছে। ইতিহাসের পাতায় হয়তো নয়, লোকশ্রুতিতে। তা লোককাহিনী, লোকশ্রুতি কিংবা কিংবদন্তিকে কি আর রূপকথার গল্পের মতো উড়িয়ে দেয়া যায়! এসবও তো আসলে ইতিহাস। মৌখিক ইতিহাস। সাধারণ মানুষের স্মৃতি এর আধার। লোকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সে মৌখিক ইতিহাস শুনে বড় হয়। হয়তো বারবার তথ্য গ্রহণ-বর্জনে মূল ইতিহাসের সঙ্গে এর যোগাযোগ তেমন থাকে না আর। এক পৃথক ভাষ্য তৈরি হয় তখন। তবু ইতিহাস থেকে পুরোপুরি তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কি? পড়ে না বলেই ঐতিহাসিক তথ্যের অপ্রাপ্তির ফাঁকফোকর ভর্তির চেষ্টা চলে লৌকিক ইতিহাস দিয়ে। ফিঞ্চ কিংবা টেরিদের যুক্তি নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আনারকলি-উপাখ্যান তাই মিথ্যে হয়ে যায় না। লোকস্মৃতি আনারকলিকে ধারণ করে। ধারণ করে তার প্রেমের আখ্যানকে। আর সে পরম্পরা চলে এসেছে জাহাঙ্গীরের আমল থেকেই। ফিঞ্চের সাক্ষ্য সে ইঙ্গিতই দেয়।

অন্তঃপুর-হারেমের কেচ্ছাকে বাইরের জগৎ থেকে আড়াল করার একটা প্রবল চেষ্টা সব যুগেই দেখা যায়। আর সে যদি হয় রাজ-অন্তঃপুর কিংবা বাদশার হারেমের কিস্সা, তাহলে তো কথাই নেই। সে চেষ্টা তখন জোরদার হয় আরো। চেষ্টা চলে প্রকৃত ইতিহাস গোপন করার। রাষ্ট্রযন্ত্র যদিও সর্বশক্তি দিয়ে সে ঘটনা মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তবু পাঁচকান হয় সে কাহিনী। রাষ্ট্রযন্ত্র লিখিত ইতিহাসে সে ঘটনা ঠাঁই না পেলেও বাতাসে এসব কথা ঠিকই ভেসে বেড়ায়। এভাবেই তৈরি হয় লোকশ্রুতি। তৈরি হয় লোক-আখ্যান। ফিঞ্চ কিংবা টেরির মতো ঐতিহাসিকরা সে কাহিনীকে ঠাঁই দেন ইতিহাসের পাতায়।

 

লেখক: জয়িতা দাস, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নন-ফিকশন লেখক।