কালীগঞ্জে উদ্বোধন করা হলো ‘ঈশা খাঁ’র আধুনিক সমাধি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলার প্রতাপশালী বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে ঈশা খাঁ ছিলেন অন্যতম। বাংলার ইতিহাসের অন্যতম এই বীরের অরক্ষিত সমাধিস্থল (কবর) যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলসমৃদ্ধ একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমাধি (সংস্কার-পরবর্তী) নির্মাণ শেষে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার (১ ডিসেম্বর) দুপুরে কালীগঞ্জের বক্তারপুরে ঈশা খাঁ’র সমাধি চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে আধুনিক সমাধিটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস. এম. তরিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিবলী সাদিক।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক এস. এম. তরিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিবলী সাদিকের উদ্যোগে ও পরিকল্পনায় উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নের ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ঈশা খাঁ’র আধুনিক সমাধি নির্মাণ করা হয়েছে।
এর আগে ২৬ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) সকালে ঈশা খাঁ’র সমাধিস্থলে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিবলী সাদিক।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে ‘ঈশা খাঁ’র সমাধিস্থলে লাল সিরামিক ইট দিয়ে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলসমৃদ্ধ সাড়ে ১৭ ফিট উচ্চতার এবং ২৪ ফিট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমাধিস্থ নির্মাণ করা হয়েছে।
“প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এফ বি ব্রাডলি-বার্ট’র ১৯০৬ সালে প্রকাশিত “দ্য রোম্যান্স অফ অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল” গ্রন্থের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন “বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুরে ঈশা খাঁ’র কবর অবস্থিত”।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলার প্রতাপশালী বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে ঈশা খাঁ ছিলেন অন্যতম। তিনি ১৫২৯ বা ১৫৩৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কালিদাস গজদানী অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম হয় সুলাইমান খাঁ। ঈশা খাঁ’র বাংলো বাড়ি কিশোরগঞ্জে অবস্থিত। ১৫৪৫ সালে সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক ভ্রাতুস্পুত্রকে ঈশা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁ’কে একদল অনেকের তুরাণী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ১৫৬৩ সালে ঈশা খাঁ’র চাচা কুতুব খাঁ বহু অনুসন্ধানের পর সুদুর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে দুই পুত্রকে উদ্ধার করেন। সে সময় ঈশা খাঁ’র বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর।
১৫৭৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বিজয়ের পর বারো ভূঁইয়াদের দমন করতে অভিযান পরিচালনা করে বিফল হয়ে পরবর্তীতে সেনাপতি মানসিংহকে পাঠান ঈশা খাঁকে দমনের জন্য, কিন্তু বীর ঈশা খাঁ সেনাপতি মানসিংহকেও যুদ্ধে পরাজিত করেন। ১৫৯৬ সালে দুর্জন সিং অনেক মুঘল সৈন্যসহ ঈশা খাঁ এবং মাসুম খাঁ কাবুলির সম্মিলিত বাহিনীর হাতে নিহত হন। অনেকে বন্দী হন। ঈশা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে বন্দীদের মুক্তি দেন এবং মানসিংহের সাথে আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সম্রাট এ বীর পুরুষকে দেওয়ান ও মসনদ-ই-আলা উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে ঈশা খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। বক্তারপুর বাজারের সন্নিকটে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
স্থানীয়রা জানায়, ঈশা খাঁর কবরটি দীর্ঘদিন ‘একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি’র হিসেবে এলাকাবাসী জানত। ৩৫-৪০ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বক্তারপুর গ্রামে এসে কবরটি ঈশা খাঁর সমাধি বলে চিহ্নিত করে। লোকজন বেড়া দিয়ে কবরটি সংরক্ষণের চেষ্টা করে। বক্তারপুর দুর্গের অস্তিত্ব আর এখন নেই। মাটি খুঁড়লে প্রাচীন ইট বের হয়। দিঘিটি প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। ঈশা খাঁ’র কবরের স্থানটি একটু উঁচু ঢিবির মতো ছিল। পূর্বপুরুষরা বলে গেছে এটি পবিত্র স্থান। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ স্থানটি খনন করে। প্রাচীন ইট ও কবর আকৃতির সমাধি আবিষ্কৃত হয়। পরে তারা জানায় যে, এটি ঈশা খাঁ’র সমাধিস্থল।

বক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুঃ আতিকুর রহমান আকন্দ বলেন, ৩০-৩৫ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বক্তারপুর পুরোন দিঘির পশ্চিমে পারে থাকা কবরটি ঈশা খাঁর সমাধি বলে চিহ্নিত করেন। পরে লোকজন বেড়া দিয়ে কবরটি সংরক্ষণের চেষ্টা করে। এরপর ২০০৪ সালে প্রথম উপজেলা প্রশাসন দেয়াল তুলে কবরটি ঘিরে দেয়। পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কবরটির চারদিকে ইটের দেয়াল এবং ওপর লোহার বেড়া বেষ্টিত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, কয়েক মাস আগে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস. এম. তরিকুল ইসলাম ঈশা খাঁর সমাধিস্থল পরিদর্শন করেন। পরে তিনি সমাধিস্থে যাওয়ার মাটির সড়কটি সংস্কার করার নির্দেশ দেন। সম্প্রতি প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সমাধিস্থে যাওয়ার সড়কটি ১০ ফুট প্রশস্ত করে সংস্কার করে গাড়ি যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে উপজেলা প্রশাসন। গত ২৬ আগস্ট সকালে ঈশা খাঁ’র কবরে সমাধিস্থ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিবলী সাদিক।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিবলী সাদিক বলেন, ”বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁ’র অরক্ষিত সমাধিস্থল (কবর) যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস. এম. তরিকুল ইসলাম স্যারের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক সমাধি নির্মাণ করা হয়েছে। লাল সিরামিক ইট দিয়ে সমাধিস্থলে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলসমৃদ্ধ একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সাড়ে ১৭ ফিট উচ্চতার এবং ২৪ ফিট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের সমাধিস্থ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঈশা খাঁর বীরত্বের ইতিহাস এবং বাংলায় তাঁর অবদান তুলে ধরা হয়েছে।”
জানা গেছে, বাংলার বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন ঈশা খাঁ। ন্যায়পরায়ণ শাসক ও বীরত্বের প্রতীক হয়ে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। মুসলিম এ শাসকের রাজধানী ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়। মোগল শাসকদের সঙ্গে তাঁর একাধিক যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের জন্য এগারসিন্ধু ও বক্তারপুরে দুর্গ স্থাপন করেছিলেন। জীবনের শেষদিকে সোনারগাঁয় ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি অবস্থান নেন বক্তারপুর দুর্গে। সেখানে একজন প্রখ্যাত হেকিমের চিকিৎসা গ্রহণকালে ৭০ বছর বয়সে ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় তাঁর। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় বক্তারপুর দুর্গের দিঘির পশ্চিম পাড়ে। কালের পরিক্রমায় অযত্ন-অবহেলায় একসময় হারিয়ে যায় সমাধিচিহ্ন। তাঁর বীরত্ব, শাসন, মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মপরায়ণতা নিয়ে নানা জল্পনা ও কল্পকাহিনি থাকলেও ইতিহাসের কোথাও তাঁর সমাধিস্থলের কথা উল্লেখ নেই। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দীর্ঘদিন অনুসন্ধান করে বক্তারপুরের ধ্বংস হয়ে যাওয়া দুর্গে একটি প্রাচীন সমাধির সন্ধান পায়। নানা তথ্য-উপাত্ত ও ইতিহাস বিশ্লেষণ শেষে প্রত্নতত্ত বিভাগ নিশ্চিত হয় যে সমাধিটি ঈশা খাঁ’র। ঈশা খাঁ’র অনেক নিদর্শন কিশোরগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।
আরো জানতে…………..
কালীগঞ্জে ইউএনও’র উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে ‘ঈশা খাঁ’র আধুনিক সমাধিস্থ
‘কালীগঞ্জ কেন্দ্রীয় পাঠাগার’ উদ্বোধন করলেন মেহের আফরোজ চুমকি



