বাংলায় ব্রিটিশদের যুদ্ধ ঘোষণা

ধফোর্ট উইলিয়ামে কাউন্সিল কর্তৃক যুদ্ধ ঘোষণা, ৩ জানুয়ারি, ১৭৫৭

[বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে ঘোষণার ইংরেজি কপি থেকে। এই ইংরেজি কপিটি আবার একটি ডাচ কপি থেকে অনূদিত। এ ঘোষণার একটি কপি ২ জানুয়ারি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে পাঠানো হয়েছিল। শুধু ওয়াটসন নয়, এ যুদ্ধ ঘোষণার কপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের কাছে, এমনকি ইংল্যান্ডেও প্রেরণ করা হয়েছিল। তবে সম্পাদক এসসি হিল সে রকম কোনো কপি সংগ্রহ করতে পারেননি। ঘোষণাটি হিল সম্পাদিত বাংলায় ব্রিটিশরাজের নথিপত্রের সংকলনগ্রন্থ (১৯০৫) থেকে অনূদিত]

এসএম রশিদ : বাংলায় বাণিজ্যে নিয়োজিত ইউনাইটেড কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব ইংল্যান্ডবিষয়ক প্রেসিডেন্ট ও গভর্নরের পক্ষে থেকে যারা এখানে উপস্থিত তাদের শুভেচ্ছা। ১৭৫৬ সালের জুন মাসটি শান্তি ও স্বস্তিতেই কাটছিল। হিন্দুস্তানের মোগলদের দেয়া ফরমানের ওপর ভরসা করে আমরা হঠাৎই নিজেদের অসহায় অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। আমাদের নিরাপত্তা ও কোনো শাহজাদার আক্রমণ ঠেকানোর মতো কোনো অবস্থা আমাদের ছিল না। আমাদের চিন্তায় কখনো আসেনি যে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা ও মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজউদ্দৌলা সব ধরনের ন্যায়বিচার ও সমতাকে পায়ে দলে ওপরে উল্লিখিত ফরমান অমান্য করতে পারেন। অথচ কোনো উসকানি ছাড়াই সিরাজউদ্দৌলা আমাদের বিস্মিত করে আক্রমণ করেছেন। এমনটা আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। মোগল সম্রাট অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যে ফরমান দিয়েছেন সেটাও তিনি অমান্য করেছেন। এ ফরমান অমান্য করা ছাড়াও সব দেশের সাধারণ আইনও ভঙ্গ করে তিনি কাশিমবাজারে অনারেবল কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করেছেন, এর প্রধানকে বন্দি করেছেন এবং বল প্রয়োগে কুঠিস্থ বন্দুক, গোলাবারুদ, রসও অন্যান্য মালামাল কবজা করেছেন। এখানেই তিনি সন্তুষ্ট থাকেননি। হামলার কোনো কারণ দেখাননি এবং কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিলের কাছে কোনো দাবিও জানাননি।

সেই জুন মাসেই তিনি বড় সৈন্যবাহিনী—যাদের মধ্যে ছিল প্রশিক্ষিত গোলন্দাজ সেনা—নিয়ে কলকাতা ও ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে এগোতে থাকেন। তিনি এ দুর্গ দখল করে কোম্পানি ও ব্যক্তিগত সম্পদ লুটপাট করেন, অনেক সামরিক ও বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেন, অনেককে পালানোর সুযোগ দেন, এরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তার শাসনাধীন এলাকায় থাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যান্য কুঠিতেও তার নির্দেশে আক্রমণ ও লুটপাট চলেছে এবং কোম্পানির কর্মীদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তার কর্মকর্তারা কোম্পানি ও অনেকের ব্যক্তিগত অর্থ বাজেয়াপ্ত করেছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তার কর্মচারী, করদাতা থেকে শুরু করে গ্রেট ব্রিটেনের রাজার প্রজাদের বিরুদ্ধেও সহিংসতা চালানো হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলার কার্যক্রমবিষয়ক প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিলের পক্ষ থেকে রানীর ইস্ট ইন্ডিয়ার স্কোয়াড্রনের কমান্ডার-ইন-চিফ ভাইস অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসনকে এর প্রতিকার চেয়ে আবেদন করি। আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন তার স্কোয়াড্রন বাংলায় নিয়ে আসেন। বাংলায় পৌঁছে তিনি নবাবেব কাছে আমাদের অভিযোগ তুলে ধরেন, নিরাপত্তার দাবি তোলেন। তিনি আশা করেছিলেন, নবাব শান্তিপূর্ণভাবে এ টানাপড়েনের অবসান ঘটাবেন। কিন্তু নবাব অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের চিঠির কোনো জবাব দেননি। শান্তিপূর্ণভাবে ফোর্ট উইলিয়ামের দখল নিতে ভাইস অ্যাডমিরাল ওয়াটসন তার বাহিনী নিয়ে নদীপথে এগিয়ে যান। কিন্তু হুগলির তীরে থাকা নবাবের দুর্গ থেকে শত্রু গণ্য করে তাদের ওপর গোলাবর্ষণ করা হয়। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন এ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেন রানীর পতাকার প্রতি যে অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তার জবাব দেয়াটা তার কর্তব্য। সিরাজউদ্দৌলার এ দুর্গ ও ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দখলে নিতে হবে এবং নৌবাহিনীকে কলকাতার কাছে নিয়ে আসতে হবে। যেভাবে তিনি শত্রুজ্ঞানে গোলাবর্ষণ করেছেন, সেভাবেই বল প্রয়োগে ফোর্ট উইলিয়াম দখল করতে হবে। এরই মধ্যে প্রদর্শন করা শত্রুতা ও সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বাংলায় তাদের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে আমরা প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি।

বিভিন্ন জাতির স্বীকৃত নিয়ম মেনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তার কর্মচারী, প্রজাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়া এবং মোগলদের দেয়া সনদ অনুযায়ী নির্মিত বাণিজ্যকুঠি ও শহরগুলো পুনরুদ্ধার পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। এ অঞ্চলে আমাদের সেনাসমাবেশ নিয়ে যেন কোনো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি না হয়, তাই আমরা ঘোষণা করছি যে বাংলায় বসবাসরত কোনো ইউরোপীয় যদি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোনো তত্পরতায় লিপ্ত না হয়, তাহলে তাদের কোনোভাবেই বিরক্ত করা হবে না। আর যে জমিদাররা সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে অস্ত্রধারণ করবেন না, তাদেরও শান্তিপূর্ণভাবে থাকার নিশ্চয়তা দেয়া হচ্ছে।

(ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদটি করেছেন এসএম রশিদ)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button