তুর্কি খেলাফত, ভারতীয় নিজামত ও প্রিন্সেস নিলুফার

এমএ মোমেন : ভারতীয় রাজা-মহারাজাদের ইউরোপ ও আমেরিকান নারী বিয়ে করাটা একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে উঠেছিল। একটি-দুটি বাদে প্রায় সব নারী খুবই সাধারণ ঘরের এবং প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্রের, ভারতে এসে রানী-মহারানী হয়েছেন।

রাজা মার্তন্ড বাহাদুর এক ইংরেজ রমণীকে বিয়ে করে অমূল্য অলংকার ও দুর্লভ পাথর উপহার দিয়ে তাকে নিয়ে ইউরোপ চষে বেড়িয়েছেন। লন্ডন ও প্যারিসে বড় বড় পার্টি দিয়ে নাম কামিয়েছেন।

নবাব তালেহ মোহাম্মদ খান রাজকোষের বহু মূল্যবান সম্পদ এক ইংরেজ তরুণীকে দিয়ে তাকে মহারানী করে এনেছেন। রাজা নটবর সিং এক ইংরেজ নারীকে বিয়ে করে সংসারের খরচ ও স্ত্রীর চাহিদা মেটাতে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত রত্ন বিক্রি করতে শুরু করেন।

ইন্দোরের মহারাজা তুকোজি রাও ও তার পুত্র উভয়ে আমেরিকান নারী বিয়ে করেন। ইংরেজ নারী ডারোথিকে বিয়ে করেন জিন্দের (পাঞ্জাবের অন্তর্গত) বধির মহারাজা রণবীর সিং রাজিন্দর বাহাদুর।

অযোধ্যার রাজকুমারী সুরিরত্না খ্রিস্ট জন্মের ৪৮ বছর পর কোরিয়ায় গিয়ে কিম সুরোকে বিয়ে করেন এবং ১০ পুত্রসন্তানের জননী হন। বলা হয়ে থাকে, অযোধ্যায় রাজা স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে ১৬ বছর বয়সী রাজকন্যাকে কোরিয়ার রাজাকে বিয়ে করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। সুরিরত্নার সৌন্দর্যমুগ্ধ কিম সুরো তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। সমুদ্রপথে কোরিয়ায় পৌঁছতে তার দুই মাস লেগেছিল। তারাই ‘করাক’ রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন।

হায়দরাবাদের নিজাম পরিবারের রাজপুত্ররা ভিনদেশী রাজকন্যা বিয়েতে ভারতের প্রিন্সলি স্টেটের সবাইকে হারিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ খেলাফত তুরস্কের উসমানিয়া রাজবংশের শাসনাধীন ছিল। সর্বশেষ উসমানিয়া ও তুর্কি প্রজাতন্ত্রের সর্বপ্রথম খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদের দুর্ভাগ্য প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর সময়টা রাজতন্ত্রের পক্ষে ছিল না, ছিল প্রজাতন্ত্রের পক্ষে।

মুস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে ১ নভেম্বর ১৯২২ উসমানিয়া শাসনের অবসান ঘটলেও ১৯ নভেম্বর ১৯২২ তুর্কি জাতীয় পরিষদ সিংহাসন ও খেলাফতের বৈধ দাবিদার আবদুল মজিদকে খলিফা নির্বাচিত করে।

তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ছয় মাস পর ৩ মার্চ ১৯২৪ উসমানিয়া খেলাফত অবলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং খলিফাকে সপরিবারে তুরস্ক থেকে নির্বাসিত করা হয়। এ সিদ্ধান্তে একটি বিদ্রোহের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু খলিফা বুঝতে পেরেছিলেন রাজতন্ত্র ও খেলাফত তখন আর সময়ের দাবি নয়। তিনি তার অনুসারীদের নিরস্ত করেন। পরদিন ভোর ৫টায় ইস্তানবুলের দোলমাবাচে প্রাসাদ থেকে সঙ্গোপনে সপরিবার বেরিয়ে যান। রেলযোগে সুইজারল্যান্ড সীমান্তে পৌঁছেন। সীমান্তে কিছুক্ষণ আটকে থাকার পর পরিবারটিকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। তিনি পৌঁছে বিবৃতি দেন খেলাফতের অবলুপ্তিতে ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং উগ্রবাদ বেড়ে যাবে।

তুর্কি সরকারের অনুরোধে সুইজারল্যান্ড সরকার তাকে অন্যত্র চলে যাওয়ার অনুরোধ করে। ১০ বছর বয়সী প্রিন্সেস দুরুশেহভার এবং আট বছর বয়সী প্রিন্সেস নিলুফার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ১৯২৪-এর অক্টোবরে ফ্রান্সের নিস শহরে যখন পৌঁছেন তখন অবদুল মজিদ ক্ষুধার্ত, গৃহহীন এবং দরিদ্রও।

ভারতীয় খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ও খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। নেতৃত্ব দানকারী মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয় খলিফা আবদুল মজিদের পরিচিত ছিলেন। দুর্দশাগ্রস্ত নির্বাসিত খলিফাকে নিয়মিত একটি অনুদান দিয়ে সহায়তা করতে তারা হায়দরাবাদের সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলী খান আসফ জাহকে সম্মত করান। নিজাম তখন থেকেই প্রতি মাসে ৩০০ পাউন্ড পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাতে বিপদাপন্ন রাজকন্যাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পড়াশোনার সমস্যা অনেকটা মিটে যায়।

আরো সাত বছর পর ১৯৩১ সালে খলিফা আবদুল মজিদ যখন তার বড় মেয়ে দুরুশেহভারের বিয়ের জন্য পাত্রের সন্ধান করছিলেন, ভারতীয় খেলাফত নেতা শওকত আলী হায়দরাবাদের নিজাম ওসমান আলী খানের পুত্র আজম জাহর নাম প্রস্তাব করেন। নিজাম তুর্কি খলিফার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠলেন, কিন্তু খলিফা কন্যার জন্য বড় অংকের মোহরানা দাবি করে বসায় বিয়েটি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। শেষ পর্যন্ত ৪০ হাজার পাউন্ড মোহরানায় বিয়ে চূড়ান্ত হয়। এ বিয়ের প্রস্তাবকদের মধ্যে কবি আল্লামা ইকবালও ছিলেন। নিজাম ওসমান আলী চাচ্ছিলেন একই অনুষ্ঠানে তার দ্বিতীয় ছেলে মুয়াজ্জম জাহর বিয়েটাও হয়ে যাক।

দুরুশেহভারের চাচাতো বোন প্রিন্সেস নিলুফারকে পাত্রী সাব্যস্ত করা হলো। লন্ডন থেকে দুই ভাই আজম ও মুয়াজ্জম পাত্রী দেখতে এলেন। ১২ নভেম্বর ১৯৩১ দক্ষিণ ফ্রান্সের নিস শহরে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ খেলাফত ও নিজামতের মিলন ঘটল। দুজনই ভারতবর্ষে নিয়ে এলেন তুর্কি আভিজাত্য ও সংস্কৃতি।

নিলুফার হানিম সুলতানের জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯১৬ ইস্তানবুলের গোজতেপি রাজপ্রাসাদে। তার বয়স যখন দুই বছর তখন তিনি বাবাকে হারান। খেলাফত ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাকেও নির্বাসিত করে। সে সময় সংকটের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে তার নির্বাসিত জীবন শুরু হয়।

নিজামের দ্বিতীয় পুত্র মুয়াজ্জম জাহর জন্য বিখ্যাত রণাঙ্গন নেতা আনোয়ার পাশার কন্যা মাহপেকার হানিম সুলতান প্রস্তাবিত হন। কিন্তু খলিফার পরিবারের শাহাজাদা ওসমান ফুয়াদ ও তার স্ত্রী মিসরীয় প্রিন্সেস কেরিম হালিম অর্থবিত্তের কথা ভেবে নিলুফারের জন্য মোয়াজ্জেম জাহকে অগ্রাধিকার দিলেন এবং মুয়াজ্জমও সুন্দরী নিলুফারকে দেখে তাত্ক্ষণিকভাবে তাকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন।

ফ্রান্সের খবরের কাগজে ভারতীয় দুই প্রিন্সের বিয়ের খবর ফলাও করে ছাপা হলো, ‘হাজার এক রজনীর গল্প ও একটি মুসলিম বিয়ের অনুষ্ঠান’। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বিয়ে হলো। তারপর ব্রিটিশ দূতাবাসে উভয়েরই সিভিল ম্যারেজ এবং মোহরানার ৪০ হাজার পাউন্ডের (৭৫ হাজার ডলার) চুক্তি স্বাক্ষর হলো। স্বামীর মৃত্যু হলে কিংবা তালাক দিলে এ অর্থ স্ত্রীর প্রাপ্য হবে।

দম্পতিদ্বয় ১২ ডিসেম্বর ১৯৩১ ভেনিস থেকে পিলসনা নামের সমুদ্রগামী জাহাজে বোম্বে রওনা হলেন। নিলুফারের মাও তাদের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক সেরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও একই জাহাজে ভারতে ফিরছিলেন। তিনি জাহাজে প্রিন্সেসদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে শোনা যায়।

জাহাজে তাদের শাড়ি পরা এবং নিজামের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ শেখানো হয়েছিল। নিলুফারের মা মেয়ের জন্য প্রশিক্ষিত ফরাসি মিডওয়াইফ নিয়ে এসেছেন। মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়বে, তখন তাকে প্রয়োজন হবে। বোম্বে থেকে নিজামের ব্যক্তিগত ট্রেনে তারা হায়দরাবাদ এসে পৌঁছলেন। তাদের রাজকীয় সংবর্ধনা জানানো হলো। ৪ জানুয়ারি ১৯৩২ চৌমহলা রাজপ্রাসাদে সংবর্ধনা ব্যাঙ্কোয়েট অনুষ্ঠিত হলো।

নিলুফার ও মুয়াজ্জম জাহ নওবাত পাহাড়ে হিল ফোর্টের বাড়িতে উঠলেন। মুয়াজ্জম জাহ স্ত্রীর পোর্ট্রেট করালেন, ছবি তুললেন। কিন্তু প্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটল না—তিনি গর্ভবতী হলেন না। কয়েক বছর কেটে গেল। এর মধ্যে দুরুশেহভার দুই পুত্রসন্তানের মা হয়ে পড়ায় তিনি আরো ভেঙে পড়েন। তুর্কি খলিফার পরিবার ও নিজামের পরিবারের ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীলতা নারীকে অন্দরমহলেই রাখে। নারীর সম্মান ও মর্যাদা পুরুষচক্ষুর আড়ালে জেনানা মহলে—এ মিথ ভেঙে নিলুফার বাইরে চলে এলেন। তিনি লেডি হায়দারি ক্লাবের নিয়মিত উপস্থিতদের একজন হয়ে উঠলেন। স্বাধীনভাবে শহরে ঘুরতে শুরু করলেন এবং গভীর রাতে ককটেল পার্টি থেকে বাড়ি ফিরলেন। নিজামতের আওতায় বহু ধরনের অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি হিসেবে যোগ দিলেন। বহু কিছু উদ্বোধন তিনি করলেন। তিনি নারী উন্নয়নে কাজে নামলেন। তার প্রতি সংবাদপত্রের আগ্রহ বেড়ে গেল। একটি পত্রিকা তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০ সুন্দরীর একজন আখ্যা দিল।

নেকাব ছাড়া জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি পর্দার অচলায়তন ভাঙলেন। যেখানে নিজামের কন্যারাও তাকে ‘সরকার’ বলে সম্বোধন করতেন এবং সঙ্গে সৌজন্যমূলক শব্দ যোগ করতেন, সেখানে নিলুফার ডাকছেন ‘পাপা’। তিনি দীর্ঘদিন ইন্ডিয়ান উইমেন কনফারেন্স হায়দরাবাদ চ্যাপ্টারের সভানেত্রী ছিলেন। সরোজিনী নাইডুর কন্যা পদ্মজা নাইডুর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং বিমান আক্রমণের সময় সহায়তার প্রক্রিয়াও শিখেছেন।

অরবিন্দ আচার্যের সংগ্রহে নিলুফারের বিভিন্ন কাগজপত্র এবং তাকে লেখা বিভিন্ন বিশিষ্টজনের আবেগময় চিঠিপত্রও রয়েছে। এসব থেকে উঠে এসেছে, তিনি ভেতরে ভেতরে নিঃসঙ্গ ও অসুখী ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তার এক নারী ভৃত্য রাফাতুন্নিসা গর্ভকালের শেষ দিকে ছুটি নেয়। রাফাত আর ফিরে আসেনি। প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। নিলুফারের তখনকার একটি উক্তি ভারতবর্ষে স্মরণীয় হয়ে আছে: ‘আর কোনো রাফাত নয়’। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মায়েদের প্রসবকালীন ঝুঁকি কমাতে উদ্যোগ নেবেন। তিনি শ্বশুর ও নিজাম ওসমান আলী খানের সঙ্গে আলাপ করে মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল নির্মাণে হাত দিলেন। রেড হিলস এলাকায় হাসপাতাল তৈরি হলো। দরিদ্র মায়ের পক্ষে খরচ দেয়া সম্ভব হবে না মাথায় রেখেই তিনি পরিকল্পনা করলেন শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, তাদের আহার সরবরাহ ও আর্থিক সাহায্যও করা হবে। কিছুটা কাজ বাকি থাকতেই তিনি প্যারিস ফিরে গেলেন। ১০০ শয্যার হাসপাতালটির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি থাকতে পারেননি। প্রিন্স মুয়াজ্জমের সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল হয়ে পড়েছিল। ১৯৪৭-এর ভারতভাগের পর হায়দরাবাদ স্বাধীন সত্তা নিয়ে টিকে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু পরের বছর ভারতীয় বাহিনী নিজামের বিশাল পরগনা দখল করে নেয়। এটি ছিল গোটা নিজাম পরিবারের ওপর বড় আঘাত। মুয়াজ্জম জাহ কবিতা ও গান নিয়ে পড়ে রইলেন। তার রাত্রিকালীন অস্বামীসুলভ জীবন নিলুফারকে আরো বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তিনি নিজামের কাছে নালিশ করেন। তাতে কোনো প্রতিকার মেলেনি। দুজন সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন জগতের মানুষ হয়ে পড়েন। ১৯৫২তে তাদের তালাক হয়ে যায়। নিলুফার আর ভারতে ফিরে আসেননি। কৃতজ্ঞ হায়দরাবাদবাসী হাসপাতালটিতে নিলুফারের নাম দেন। অল্প সময়ে হাসপাতালটি সুখ্যাত হয়ে ওঠে।

মুয়াজ্জম জাহ আবার বিয়ে করেন এবং ছয় সন্তানের জনক হন। নিলুফারও এডওয়ার্ড জুলিয়াস পোপ নামের একজন মার্কিন ব্যবসায় নির্বাহীকে বিয়ে করেন। মুয়াজ্জম জাহ ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে ৮০ বছর বয়সে মারা যান। দুই বছর পর ১২ জুন ১৯৮৯ নিলুফার প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানে সমাহিত হন।

লেখক: এমএ মোমেন, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button