প্রতিকূল ও বিরূপ পরিবেশেও ঢাকায় টিকে আছে ১৩৭ প্রজাতির প্রজাপতি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গত কয়েক দশকে রাজধানী ঢাকার সম্প্রসারণ হয়েছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। নগরীর আয়তন ও জনসংখ্যা দুটোই বেড়েছে। সম্প্রসারণের এ ধারা ছিল অনেকটাই অপরিকল্পিত। দালানকোঠাসহ নানা অবকাঠামোর আগ্রাসনে দিনে দিনে কমেছে সবুজ এলাকার পরিমাণ। দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নগরীর প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান। এর মধ্যেও ঢাকায় যেটুকু সবুজ দেখতে পাওয়া যায়, সেটুকুকে ঘিরেই টিকে রয়েছে প্রজাপতির বেশকিছু প্রজাতি।

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিকূল পরিবেশে ঢাকায় এখনো প্রজাপতির বেশকিছু প্রজাতি টিকে রয়েছে। তবে সবুজের পরিমাণ হ্রাস ও দূষণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে রাজধানী থেকে এর অনেকগুলোই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।

বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন বছর ধরে প্রজাপতির প্রজাতি সংখ্যা নিয়ে জরিপ চালিয়েছেন দেশ-বিদেশের বেশ কয়েকটি সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও চেক প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসটিইউ) গবেষকরাও এতে অংশ নিয়েছেন।

তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের শাওন চৌধুরী, এনএসটিইউর শিহাব এ শাহরিয়ার, জুওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের মনিকা বম, সিঙ্গাপুরভিত্তিক বার্ড লাইফ ইন্টারন্যাশনালের অনুজ জৈন, ঢাবির দীপঙ্কর কুমার রায় প্রমুখ।

২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছর ধরে ঢাকার এলাকা তিনটিতে মাসভিত্তিক জরিপ চালিয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি চালানো হয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, সারা দেশে প্রজাপতির ৩০৫ প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ঢাকায় দেখতে পাওয়া যায় ১৩৭ প্রজাতি। সে হিসেবে সারা দেশে প্রজাপতির স্বীকৃত প্রজাতিগুলোর মধ্যে ৪৫ শতাংশ ঢাকায় খুঁজে পাওয়া যায়। এর মধ্যে আবার ৪০ শতাংশ প্রজাতির অস্তিত্ব সারা দেশেই এখন হুমকির সম্মুখীন। গবেষণায় পাওয়া তথ্য সম্প্রতি জার্নাল অব আরবান ইকোলজিতে ‘আরবান গ্রিন স্পেসেস ইন ঢাকা, বাংলাদেশ, হারবার নিয়ারলি হাফ কান্ট্রিজ বাটারফ্লাই ডাইভারসিটি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের ভাষ্যমতে, গবেষণার আওতাধীন তিন বছরেই এলাকা তিনটিতে প্রজাপতির সংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে দেখা গিয়েছে। বিপন্ন প্রজাতিগুলোর মধ্যেই এ হ্রাস পাওয়ার গতি দেখা গিয়েছে সবচেয়ে বেশি।

শুধু সৌন্দর্য নয়, পরিবেশে অবদানের দিক থেকেও অনন্য এক পতঙ্গ বলা হয় প্রজাপতিকে। পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভিদের বংশ বিস্তারে অবদান রাখে পতঙ্গটি। উদ্ভিদের অধিকাংশ প্রজাতি বংশ বিস্তারের জন্য প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নের মাধ্যমগুলোর (পলিনেটর) ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া বাস্তুসংস্থানের নিচের দিকের প্রাণী হিসেবেও পতঙ্গটির অস্তিত্বের সঙ্গে প্রাকৃতিক খাদ্যচক্রের ভারসাম্যের বিষয়গুলো জড়িত।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু প্রজাপতি বা মৌমাছি বিলুপ্ত হলে এর ধারাবাহিকতায় প্রকৃতিতে আরো অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদের বিলোপের আশঙ্কা তৈরি হবে। এছাড়া প্রজাপতির উপস্থিতি কোনো এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বৈচিত্র্যের অবস্থারও অন্যতম নির্দেশক।

এছাড়া প্রজাপতির উপস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও জড়িত বলে বেশকিছু গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশবিদ ও ব্রডকাস্টার স্যার ডেভিড অ্যাটেনবার্গও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, শুধু প্রজাপতি দেখেও যদি প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো যায়, তাহলে সেটুকুও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী।

তার ভাষ্যমতে, সংরক্ষণ কার্যক্রম চালাতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, গ্রামাঞ্চলের চেয়ে নগর ও শহরগুলোয় প্রজাপতির সংখ্যা তুলনামূলক দ্রুতগতিতে কমছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও শহরাঞ্চলে প্রজাপতির সংখ্যা দ্রুততার সঙ্গে কমে আসছে। এর কারণ সম্পর্কে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রজাপতি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি পতঙ্গ। আবাসস্থলের চারপাশের পরিবেশে সামান্যতম পরিবর্তনও পতঙ্গটির অস্তিত্বকে নাজুক করে তোলে। বিশেষ করে আবাসস্থলে তাপ ও আলোর মাত্রা, মাটির গঠন, বিকিরণ, আর্দ্রতা, সূর্যালোকের পর্যাপ্ততার মতো বিষয়গুলোয় সামান্যতম ওঠানামা হলেই প্রজাপতির জন্য সেখানে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। এর কোনো কোনোটিতে সামান্যতম পরিবর্তনের কারণেও প্রজাপতি দল বেঁধে ওই এলাকা ত্যাগ বা বিলুপ্ত হয়ে পড়ার নিদর্শনও রয়েছে অনেকে।

ঢাকার তিন এলাকায় পরিচালিত গবেষণাটিতেও দেখা গিয়েছে, প্রজাপতি সাধারণত হইহট্টগোলমুক্ত সবুজ এলাকায় থাকতেই পছন্দ করে বেশি। বিশেষ করে তুলনামূলক কম জনসমাগমপূর্ণ স্থান হওয়ায় বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রজাতির প্রাচুর্যও অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। এর আগেও বেশকিছু পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, কোলাহলের কারণে প্রজাপতিকে নগরের সবুজ এলাকাগুলো ত্যাগ করতে দেখা গিয়েছে।

বাটারফ্লাই বাংলাদেশের অমিত কুমার নিয়োগী প্রজাপতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা চালাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি বলেন, প্রজাপতির উপস্থিতিকে দেখা হয় পরিবেশের অবস্থার নির্দেশক হিসেবে। ঢাকায় পতঙ্গটির সংখ্যা এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কমছে। এর পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এখানে সবুজের ভাগ দিন দিন কমে আসা ও প্রজাপতির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এছাড়া প্রতিটি প্রজাপতিই তাদের জীবনকাল কাটায় নির্দিষ্ট উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে। এ কারণে নগরীতে উদ্ভিদের সংখ্যা যত কমছে, প্রজাপতির প্রজাতি বৈচিত্র্যও ততটা কমবে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পর থেকে ঢাকায় প্রজাপতির বৈচিত্র্য আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ওই সময়ের পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকায় প্রজাপতির প্রজাতি সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে প্রজাপতির প্রজাতির সংখ্যা আসলে কত, তা নিয়ে নানা তথ্য পাওয়া যায়। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বলছে, এর সংখ্যা ৩০৫টি। তবে বিভিন্ন প্রকাশনা, বই, থিসিস, অপ্রকাশিত তথ্য ও কনফারেন্সে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫৮২টি প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্তের দাবি এসেছে। এর মধ্যে এখন ৪৪০টি থেকে ৪৫০টির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। তবে এর সব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়নি।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button