লেভেল ক্রসিং কার, মৃত্যুর দায় কে নেবে?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশে রেললাইনের লেভেল ক্রসিং মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে কোনো লেভেল ক্রসিং-ই তারা তৈরি করেননি। তাই লেভেল ক্রসিং-এ মৃত্যুর দায় তারা নেবে না। তাহলে দায় কার?

নারায়ণগঞ্জে লেভেল ক্রসিং-এ বাসে রেলের ধাক্কায় তিনজনের মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় লেভেল ক্রসিং। বাসটি রেললাইনের ওপরে ছিল, কিন্তু আগে থেকে লেভেল ক্রসিং-এর যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লেভেল ক্রসিং-এ গেটম্যান থাকলেও তিনি যানবাহন চলাচল বন্ধ করেননি। সিগনাল বাতি ছিলো অকার্যকর।

বাংলাদেশে রেললাইনের লেভেল ক্রসিংগুলোর অবস্থা কমবেশি এরকমই। গেট আছে তো গেটম্যান নাই । গেটম্যান আছে তো সিগনাল বাতি নাই। আর গেট থাকলেও তা কাজ করে না। আবার অনেক জায়গায় গেটম্যানই নেই, স্থানীয় লোকজন পরিচালনা করে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন,”এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হলো লেভেল ক্রসিং-এর ৮০-৮৫ ভাগই অবৈধ। এগুলো রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করা হয়নি। অনেক লেভেল ক্রসিং-ই সড়ক ও জনপথ বিভাগের তৈরি। এর বাইরেও স্থানীয় লোকজন নিজেদের স্বার্থে লেভেল ক্রসিং তৈরি করেছেন।”

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার তথ্যমতে বাংলাদেশে এখন রেললাইনের পরিমাণ দুই হাজার ৯৯৫ কি.মি.। কর্মকর্তা ও কর্মচারী ২৫ হাজার ৮৩ জন। রেললাইনে মোট দুই হাজার ৮৫৬টি লেভেল ক্রসিং থাকলেও তার মধ্যে রেলওয়ে দেখাশোনা করে এক হাজার ৪৫টি। বাকি এক হাজার ৩৬১টি স্থানীয়ভাবে দেখা হয়। যেগুলো রেল কর্তৃপক্ষ দেখে তারও ৩৬২টিকে কোনো গেটম্যান নেই। এর বাইরেও লেভেল ক্রসিং আছে যার সঠিক হিসাব নেই। সার্বিক বিবেচনায় ৮০ ভাগের মত লেভেল ক্রসিং-এ কোনো গেটম্যান নাই, নিরাপত্তা নাই। ওই কর্মকর্তা জানান, গেটম্যান বা গেট কিপারদের বড় অংশই অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া। আর ২৪ ঘণ্টা গেট কিপিং-এর জন্য কোনো শিফট নাই। ২০১৯ সালে সর্বশেষ ২৬৩ জন অস্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ দেয়া হয়।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্যমতে ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারাদেশে ট্রেনে কাটা পড়ে ৯ হাজার ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর এই সময়ে শুধু লেভেল ক্রসিং-এ ৩১০টি দুর্ঘটনায় ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

শামসুল হক বলেন,”শুধু লেভেল ক্রসিং নয় পুরো রেললাইনেই মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি। রেললাইনের পাশে বাজার বসছে। কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেই। আর পুরো রেললাইন ব্যবস্থাপনাই সেকেলে। রেল লাইনের ওপর দিয়ে লেভেল ক্রসিং থাকতে পারে না, এটা মাটির নীচ দিয়ে অথবা উপর দিয়ে হবে।”

তিনি আরও জানান, “ট্রেনে কাটা পড়ে বা লেভেল ক্রসিং-এ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের বিরুদ্ধে মামলা হবে না। তাকে দায়মুক্তি দেয়া আছে। কারণ রেলগাড়ি দ্রুত ব্রেক করতে পারে না। করলে রেলযাত্রীদের প্রাণহানির আশঙ্কা আছে। তাই ট্রেন চলে যাবে। সে কারণে ব্যবস্থাপনাও সেটা মাথায় রেখেই হওয়া দরকার। বাংলাদেশে গড়ে প্রতি কিলোমিটার রেললাইনে একটি করে লেভেল ক্রসিং আছে। এর ৮৫ ভাগই আবার অরক্ষিত।”

আর এইসব লেভেল ক্রসিং-এর কোনোটিরই দায় নিতে রাজি নয় রেল কর্তৃপক্ষ। তাদের কথা তারা কোনো লেভেল ক্রসিং তৈরি করেনি। তাহলে দায় কেন তাদের হবে?

রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার দাবি করেন,”কোনো লেভেল ক্রসিং-ই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তৈরি করেনি। এগুলো তৈরি করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিইডি সিটি কর্পোরেশন ও পৌর কর্তৃপক্ষ। এগুলো বেআইনি। রেললাইনকে ক্রস করা যায় না। মাটির নীচ থেকে অথবা উপর থেকে (ওভার পাস) যেতে হবে। কারণ রেল তার মতো চলে যাবে। তাই এগুলো যারা তৈরি করেছেন দেখার দায়িত্ব তাদের। তারপরও আমরা মানবিক কারণে দেখছি। কিন্তু সব দেখতে পারি না।”

তিনি বলেন,” বাংলাদেশে আমাদের হিসেবে দুই হাজার ৮০০ রেলগেট আছে। ঢাকার কোনো কোনো রেলগেটে ১০ জন পর্যন্ত গেটম্যান আছে। যদি প্রতি গেটে তিন শিফটে কমপক্ষে তিনজন গেটম্যান দেয়া হয় তাহলে লাগে আট হাজার ৪০০। কিন্তু আমাদের আছে দুই হাজার গেটম্যান। তার মধ্যে এক হাজার ৯০০ জন অস্থায়ী। তাহলে কীভাবে হবে?”

তার মতে, তাদের হিসেবে দুই হাজার রেলগেটের বাইরেও আরো অনেক রেলগেট আছে, কারা বানিয়েছে রেলওয়ে জানে না। সেই হিসাবও রেলওয়ের কাছে নেই।

তিনি বলেন,”মন্ত্রী মহোদয় আমাকে বলেছেন রেল ক্রসিং-এ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যারা বানিয়েছে তাদের কথা বলে দেবেন, দায় আমাদের নয়। আমরা দায় নেব না। আমরা এখন মানবিক কারণে কিছু দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের পক্ষে এত রেলক্রসিং দেখা সম্ভব নয়।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button