পারস্য থেকে বাংলার মাটিতে
আলী আমজাদ : ইতিহাসে এমন অনেক চরিত্র থাকে, গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও যাদের সম্পর্কে আলোচনা কম। ঢাকার এক কালের নায়েব-নাজিম রেজা খান তেমনই এক চরিত্র। সিরাজউদ্দৌলার সময়ের এবং বাংলার নবাব পরিবারের সঙ্গে যুক্ত রেজা খানের জীবন পুরোটা না হলেও খানিকটা নাটকীয়। মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, এমনকি আত্মীয় রেজা খান পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানির অধীনে কাজ করেন। শরীরে ইরানি রক্ত বহন করা রেজা খানের বসতি হয় বুড়িগঙ্গা তীরের শহর ঢাকায়। কিন্তু সে পর্যন্ত পৌঁছতে রেজা খানকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেকটা পথ। সম্ভাব্য মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার প্রাথমিক জীবনটা তাই যথেষ্ট ঘটনাবহুল।
রেজা খানের পরিবারের আদি নিবাস ইরানের সিরাজে। ধারণা করা হয়, তার জন্ম ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে। তিনি সৈয়দ হাদি আলী খানের তৃতীয় সন্তান। হাদি আলী খান একজন চিকিৎসক ছিলেন। রেজা খান ও তার পরিবারের পরবর্তী জীবনে হাদি আলীর পেশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সে সময়ে ভারতে চলছিল মোগল বংশের শাসন। বলা হয়, ভারতে এ সময় গুণীদের কদর ছিল। ফলে ইরান-তুরান থেকে বহু লোক ভাগ্যান্বেষণে ভারত তথা মোগল ভারতে হাজির হতো। হাদি আলী খানও তার চার পুত্রকে নিয়ে ভারতের পথে রওনা হন। এ সময়ে রেজা খানের বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর।
ইরান অর্থাৎ তত্কালীন পারস্য ছেড়ে হাদির ভারতে আসার পেছনে কিছু কারণ ছিল। কারণগুলো হাদি আলীর ব্যক্তিগত নয় বরং পারস্যের দ্রুত বদলাতে থাকা রাজনৈতিক ঘটনাবলির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে গিলজাঈ আফগানদের বিদ্রোহের কারণে পারস্যের সাফাভি শাসন ভাঙতে থাকে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সাফাভিরা ছিলেন শিয়া পন্থাবলম্বী এবং গিলজাঈরা সুন্নি মুসলিম। এ কোন্দলের কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে বহু পারসিক নিজ বাসভূম ছেড়ে মোগল ভারতে আসেন। মোগলরা এদের খুশি মনে গ্রহণ করেছিল এবং বিস্তৃত মোগল ভারতের নানা কোণে পারসিকরা বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। সৈয়দ হাদি আলীর পরিবারের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে।
রেজা খানের পিতা হাদি আলী খান প্রথমে পরিবার নিয়ে দিল্লিতে যান। সেখানে হাদি আলীর ভাই নকী আলী খান সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র দরবারি চিকিৎসকদের মধ্যে পছন্দের একজন ছিলেন। হাদি আলী ও তার পরিবারের এ সময়কার অবস্থা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। হতে পারে তারা নকী আলীর গলগ্রহ হয়ে ছিলেন কিংবা হাদি আলীকে কোনো একটা চাকরি জুটিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাদি আলী সম্পর্কে আমরা পরবর্তী সময়ের অনেক তথ্য পাই এবং তা পাই গোলাম হোসেন তবাতবায়ির লেখায়। একটা সময়ে তিনি দিল্লি থেকে বাংলায় গমন করেন এবং আলিবর্দি খানের দরবারে স্থান করে নেন। চিকিৎসক ও সভাসদ হিসেবে তিনি আলিবর্দি খানের দরবারে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবাতবায়ির লেখা দেখে মনে হয় হাদি আলী খান সেখানে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। ‘সিয়ার-উল-মুতখখিরিন’-এ হাদি আলী খান সম্পর্কে তবাতবায়ি লেখেন, ‘তিনি সম্মানিত, উজ্জ্বল চরিত্র ও শ্রদ্ধাভাজন।’
হাদি আলী কখন বাংলায় এসেছিলেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না গেলেও যুক্তি মিলিয়ে একটা সম্ভাবনা পাওয়া যায়। দিল্লিতে নাদির শাহ্র আক্রমণের সময়ে দিল্লির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ভেঙে পড়লে কর্মক্ষেত্র বা নিরাপদ জীবনের আশায় আরো অনেকের মতো হাদি আলীও বাংলায় এসেছিলেন। সেখানে তিনি আলিবর্দির দরবারে ১৪ হাজার রুপি বেতনের চাকরি লাভ করেন। তিনি সম্ভবত এরপর বেশিদিন বেঁচে ছিলেন না। মৃত্যুর পর হাদি আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ হুসেইন খানকে আলিবর্দি একই পদ দান করেন। রেজা খান এ সময়ে তার তরুণ বয়স পার করছিলেন, যা তার শিক্ষায় অতিবাহিত হয়। রেজা খানের পরিবারের ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় তারা পেশাদারিত্বে গুরুত্ব প্রদান করতেন। সে কারণে রেজা খানকে প্রথমে দিল্লি এবং পরবর্তী সময়ে মুর্শিদাবাদে উঁচুমানের শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়। এর মধ্যে আরবি ও ফারসি লিখতে, পড়তে শেখা এবং অস্ত্র ও ঘোড়া চালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাশাপাশি পারিবারিক রীতির কারণে চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও কিছু জ্ঞান লাভ করেন।
পরবর্তী জীবনে মুর্শিদাবাদের চিকিৎসা এবং চিকিৎসকদের মধ্যে রেজা খান একজন পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সিরাজের পরাজয়-পরবর্তী সময়ে ইংরেজরা অনেক ক্ষেত্রে নবাবের কর্মীদের বেতন কাটলেও একজন ‘কালো ডাক্তারের’ বেতন ঠিকঠাক ছিল। বলা বাহুল্য তিনি রেজা খান। তার সম্পর্কে তবাতবায়ি বেশকিছু তথ্য দিয়েছেন। যেমন রেজা খান ইতিহাস পছন্দ করতেন। আড্ডা বা বৈঠকে বসলে তিনি নানা ধরনের পুরনো দিনের কথায় সময় কাটাতেন। সেক্ষেত্রে তিনি শ্রোতার কথা ভাবতেন না যে তারা আদৌ কিছু বুঝতে পারছে কিনা। ভাষার ওপর রেজা খানের বেশ দখল ছিল, যা তার রচিত চিঠিতে প্রমাণ পাওয়া যায়। সেকালে এটিকে একটি বিশেষ গুণ হিসেবে গ্রহণ করা হতো। অবশ্য তবাতবায়ির মতে, রেজা খানের বেশকিছু ‘দোষ’ও ছিল। তিনি তাস এবং পাশা খেলে সময় কাটাতেন। তবাতবায়ি বলেন, ‘যদিও রেজা খান সামাজিকতা পছন্দ করতেন এবং মানুষ দাওয়াত করার অভ্যস তার ছিল, কিন্তু তিনি নিজের হুক্কা অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দিতেন না। রেজা খানের সঙ্গে গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ির খানিকটা মনোমালিন্যের ঘটনাও ঘটেছে। তবাতবায়ির হজযাত্রার সময় তার বিষয় সম্পত্তি দেখাশোনার প্রস্তাব রেজা খান নাকচ করেছিলেন। সিয়ারের অনুবাদক হাজি মুস্তাফাও রেজা খান সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন। তার মতে, রেজা খান একজন সচেতন মানুষ। ‘তার বুকের ছাতি চওড়া, ঋজু শরীর, স্বর উচ্চ এবং চোখে অগ্নিশিখা দেখা যায়।’ হাজি মুস্তাফা আশা করেছেন রেজা খান ১০০ বছর বাঁচবেন।
এহেন রেজা খানের ভাগ্য খুলতে বেশি সময় লাগেনি। প্রথমে তিনি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে খোদ নবাব আলিবর্দির সুনজর পতিত হয় তার ওপর। নবাব তার ভাগ্নি রাবেয়া বেগমের কন্যার সঙ্গে রেজা খানের বিয়ে ঠিক করেন। বিয়ের মাধ্যমে রেজা খান মূলত মুর্শিদাবাদের শাসক পরিবারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন। এ সময়েও তিনি কোনো সরকারি পদ লাভ করেননি। তবে ধারণা করা হয়, তিনি প্রচুর যৌতুকের পাশাপাশি মাসোহারা এবং জায়গির পেয়েছিলেন। যে সময়ের কথা হচ্ছে, তখন নবাব আলিবর্দি খান জীবিত। তার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে সিরাজউদ্দৌলার শাসন, পলাশীর যুদ্ধ এবং ইংরেজ ক্ষমতা দখল—এমন জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে রেজা খানের উল্লেখ ততটা পাওয়া যায় না। তবে করম আলী খান বলেন, রেজা খান কাটোয়ার ফৌজদার ছিলেন। এ সময় তার উপাধি ছিল মোজাফফর জঙ্গ। সিরাজের কলকাতা আক্রমণের সময়ে তাকে এক ‘দাস্তা’ (রেজিমেন্ট) সৈন্য নিয়ে হুগলি অভিমুখে মার্চ করতে নির্দেশ দেয়া হয়, যেন ইংরেজরা তাদের জাহাজ নিয়ে পালাতে না পারে।
রেজা খান এ কাজে ব্যর্থ হলে সিরাজ তাকে অপসারণ করেন। এ প্রসঙ্গে করম আলী খান তার বইয়ে লিখেছেন রসদ, লোকবলের অভাবে তিনি ইংরেজদের পলায়নে বাধা দিতে পারেননি। কিন্তু সিরাজ সন্দেহ করেছিলেন যে মোজাফফর জঙ্গ তথা রেজা খান স্বেচ্ছায় ইংরেজদের পালাতে দিয়েছিলেন, কেননা ইংরেজদের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল। করম আলী যদিও রেজা খানের পক্ষে লিখেছেন, অনেকে মনে করেন সিরাজের সন্দেহই সত্য, যা পরে অবস্থাদৃষ্টে আরো সমর্থন পেয়েছে। তিনি ক্রমে ইংরেজদের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য রেজা খানের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে সেখানে নানা রটনা এবং অমীমাংসিত ঘটনা পাওয়া যায়। সে যা-ই হোক, পরবর্তী সাড়ে তিন বছর রাজনীতির মাঠে রেজা খানের দেখা পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের পর ইংরেজ দোসররা নবাব পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং নির্বাসন দিতে শুরু করে। বিশেষত মীরন চাইত না নবাব পরিবারে কেউই মুর্শিদাবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুক। সে কারণে অনেককে হত্যার পাশাপাশি নির্বাসন দেয়া হয়। নবাব আলিবর্দির স্ত্রী এবং দুই কন্যা, ঘষেটি ও আমিনা বেগমকে বহুদিন কারাবন্দি রাখার পর সিরাজের স্ত্রী লুত্ফুন্নেসাসহ এদের সবাইকে ঢাকায় নির্বাসিত করা হয়। এ বন্দিদের সঙ্গে রাবেয়া বেগম এবং রেজা খানও ঢাকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। রেজা খানের হয়তো ঢাকায় আসা হতো না, কিন্তু আমিনা বেগমের সঙ্গে রাবেয়া বেগমের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কারণে রাবেয়া তাদের সঙ্গী হলে রেজা খানকেও ঢাকা আসতে হয়। এরা সবাই মুর্শিদাবাদ থেকে দূরে নিরাপদ বোধ করছিলেন। নবাব কন্যা ও রেজা খানের শাশুড়ি রাবেয়া বেগমের ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল যথেষ্ট। মুর্শিদাবাদের তুলনায় ঢাকায় সে সম্পদ রক্ষা করা সহজ ছিল। এর পাশাপাশি রেজা খানের জন্য ঘটনাটি শাপে বর হয়েছিল।
তা অবশ্য আরো পরের কথা। এর মধ্যে ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে মুর্শিদাবাদের পুতুল নবাব ঋণভারে জর্জরিত হয়ে অর্থের সন্ধানে নানা ফিকির শুরু করেন। রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনায় নন্দকুমারের নানা ত্রুটির কারণে কোষাগারে টান পড়তে পড়তে শূন্যে পৌঁছে যায়। দ্বিতীয় আলমগীরের পুত্র আলী গওহর মীর জাফরকে এ বিষয়ে চাপ দিলে মীর জাফরকে বুদ্ধি দেয়া হয় রাবেয়া বেগমকে বন্দি করা বা অন্য কোনো উপায়ে তার সম্পদ গ্রহণ করা হোক। এ পর্যায়ে মীর কাসিমের সহায়তায় রেজা খান এ বিপদ থেকে রক্ষা পান। তবে তা করার জন্য রেজাকে ইংরেজদের সহযোগিতা নিতে হয়। মীর কাসিম রেজা খানকে ইংরেজদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং এজন্য মীর কাসিমকে ২৫ হাজার আশরাফি (চার লাখ রুপির সমমান) দিতে হয়েছিল।
ইংরেজদের সঙ্গে রেজা খানের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। সম্ভবত গভর্নর হলওয়েলের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। ধারণা করা হয়, আলিবর্দির সমর্থক গোষ্ঠীর মীর্জা মুহাম্মদ আলীর মতো আরো অনেককে একত্র করে মীর জাফরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। কতটা যুক্ত ছিলেন তার স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও দেখা যায়, ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝিতে ইংরেজদের কাছে তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ইংরেজরা তাকে বাংলায় একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। হলওয়েল ক্ষমতা ছাড়ার পর হেনরি ভ্যানসিটার্ট তার স্থলাভিষিক্ত হলে সে খবর নবাব, নবাবের পুত্র ও নদীয়ার রাজার পাশাপাশি রেজা খানকে জানানো হয়।
অর্থাৎ যদিও তিনি বিবাহ সূত্রে নবাব পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বাংলার রাজনীতিতে রেজা খান তখনই যুক্ত হননি। তার ভুক্তি হয়েছিল ক্রমান্বয়ে এবং এর পেছনে বিভিন্ন প্রভাবক কাজ করেছে। বাংলার রাজনীতিতে রেজা খানের নাম অত বেশি আসে না, কারণ পলাশীর সময়ে তিনি রঙ্গমঞ্চে ক্রিয়াশীল ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে উন্নতি করেন। তবে মীর কাসিমের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও রেজা খানের শুভাকাঙ্ক্ষী কম ছিল না। এমনকি রেজা খান নিজেও বহু লোকের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। আলিবর্দি খানের আত্মীয় করম আলী খান একটা সময় পর্যন্ত রেজা খানের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। করম আলী তার ‘মোজাফফরনামা’ বইটি রেজা খানকে উৎসর্গ করেন।



