বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাস তখন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পথে উড়াল দিয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তি পাওয়ার পর তার লন্ডন হয়ে ভারতে যাত্রাবিরতি নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার কথা। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন সময় ৮ জানুয়ারি। সেদিন স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু।
লন্ডনে পৌঁছেই তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরের দিন ৯ জানুয়ারি জাতির জনক লন্ডন থেকে ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেন। ১০ জানুয়ারি সকালে ভারতে পৌঁছান তিনি। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তার গোটা মন্ত্রিসভা, সশস্ত্র বাহিনীর তিন বাহিনী ও অন্যরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এ দিকপালকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। সেদিনই দুপুরের দিকে তিনি পা রাখেন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে।
আজ ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে সর্বস্তরের মানুষকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানানোর পর পরই পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রাখা হয়। মিয়ানওয়ালি কারাগারে দীর্ঘ নয় মাস কারাভোগের পর তার মুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল দেশের লাখ লাখ মানুষও। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর অনেকেই আকুল অপেক্ষায় ছিলেন তার প্রত্যাবর্তনের। তাই জাতির জনকের আগমনকে কেন্দ্র করে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানের পথ। বিকাল ৫টায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন তিনি।
সেই ভাষণে জাতির উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু সোচ্চার কণ্ঠে বলেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছ, তোমরা রক্ত দিয়েছ, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।’
‘তবে যারা দালালি করেছে যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে’ উল্লেখ করে সেই ভাষণে জাতির পিতা বলেন, ‘তাদের বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন, একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে। আমি দেখিয়ে দিতে চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালি রক্ত দিতে জানে, শান্তিপূর্ণ বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।’
এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে বঙ্গবন্ধু নিজেও আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা হিসেবে।’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাস যুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করে বাঙালি জাতি।
বছর ঘুরে প্রতিবার এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করা হয়। প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এদিনে ‘মুক্ত স্বদেশে জাতির পিতা’ প্রতিপাদ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেই আয়োজনে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিবসটি পালন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ দিনটিতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারা দেশে সংগঠনের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন ছাড়াও জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এবং টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনও করা হবে। এদিন বিকালে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায়ও উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।



