আরব উপদ্বীপের যাযাবর
মাহমুদুর রহমান : বেদুইনদের সম্পর্কে লিখতে গেলে অবচেতনেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে দুটো লাইন মাথায় ঘুরবে। যেহেতু এ লেখার বিষয়বস্তু তাদের ইতিহাস, কাব্যে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ইতিহাসে যাওয়ার আগে বেদুইনদের পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। বেদুইন শব্দটি আরবি ‘বাদাওয়ি’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘মরুভূমির বাসিন্দা’। মূলত যাযাবর বেদুইনরা গোত্রবদ্ধ গোষ্ঠী, যাদের বাস ‘বৃহত্তর আরবে’। আরব বলতে অনেকের মনে সৌদি আরব ঘুরলেও বেদুইনরা মূলত আরব উপদ্বীপের আদি বাসিন্দা। সেক্ষেত্রে কেউ যদি মানচিত্রে খেয়াল করেন, দেখা যাবে লোহিত সাগরের কূলঘেঁষা সৌদি আরব ও দক্ষিণ আরবের ইয়েমেন, এমনকি মধ্য আরবের প্রাচীন কিন্দা সাম্রাজ্য এবং লেভান্তে (সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন) বেদুইনদের বসবাস। যেহেতু বেদুইনরা যাযাবর গোষ্ঠী, সময়ের সঙ্গে তারা ছড়িয়ে পড়েছিল আরব থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ এমনকি মধ্য এশিয়ায়।
বেদুইনদের আদি ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যায় খ্রিস্টজন্মের প্রায় ছয় হাজার বছর আগ থেকে তারা আরবের স্তেপ অঞ্চলে (তৃণভূমি) বসবাস করত। খ্রিস্টপূর্ব ৮৫০ অব্দে আরবে তাদের উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে আরব। নানা অঞ্চলের বাণিজ্য কাফেলা আরব ভূমির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করত। কাফেলা থেকে গৃহীত কর বেদুইনদের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে। অবশ্য অর্থ উপার্জিত হলেও বেদুইনরা তাদের পশু পালন এবং যাযাবর জীবনই বজায় রাখে। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার অব্দ থেকে শুরু করে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত কালপর্বের বহু গ্রাফিতি ও লিপিতে তাদের এমন জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। এ কালপর্বের বহু লিপি ও দেয়ালচিত্র পাওয়া গেলেও সময়কাল নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।
প্রাচীনকাল থেকে উট, ভেড়া ও ছাগল পালন এ অঞ্চলের প্রধান জীবিকা এবং খাদ্যসংস্থান। এর সঙ্গে তারা কৃষিকাজও করত। তবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়া শুষ্ক হতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে গোত্রগুলো ভ্রাম্যমাণ জীবন ব্যবস্থা বেছে নেয়। জাবাল-আল-বুহায়স, শারজাহ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বোঝা যায় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দে পশু পালনের পাশাপাশি উপকূল অঞ্চলে মত্স্য আহরণের মাধ্যমেও যাযাবর বেদুইন গোষ্ঠী জীবিকানির্বাহ করত। অতিপ্রাচীনকালে আরব উপদ্বীপে বেদুইনদের বসতি থাকার প্রমাণ এ অঞ্চলের অসংখ্য শিলালিপি, দেয়াল ও গুহাচিত্র। পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রত্নবস্তু থেকে দেখা যায় খ্রিস্টজন্মের পর এ অঞ্চলের মানুষের ব্যবহূত অনেক উপাদান (যেমন উটের জিনপোষ) মূলত বহু প্রাচীনকালেও ব্যবহূত হতো।
প্রাচীনকালে মনুষ্য বসতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সময় নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। স্পষ্ট প্রমাণের জন্য ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ সময়ে ‘বেদুইন’ জনগোষ্ঠী সম্পর্কিত গাথা প্রভৃতি রচিত হয়। ‘আইয়াম-আল-আরব’ তথা ‘আরবের দিনকাল’ বলে পরিচিত এ সাহিত্য ধারাটিতে আরবের মানুষের মরু অভিযান, স্থানান্তর, আক্রমণ, গোত্রভিত্তিক দ্বন্দ্ব প্রভৃতি স্থান পায়। বেদুইনদের জীবন ব্যবস্থা মূলত গোত্রপ্রধান এবং গোত্রগুলো ছিল স্বায়ত্তশাসিত। অর্থাৎ বেদুইন গোষ্ঠী বলে আমরা যাদের অভিহিত করছি বা যারা পরিচিত তারা মূলত নানা গোত্রে বিভক্ত। বিষয়টি এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে বেদুইনদের মূলত কোনো একীভূত রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা ছিল না। বহুকাল ধরে এক ধরনের সাধারণ জীবন ব্যবস্থা থাকলেও গোত্র অনুসারে তাদের নিজস্ব রীতি ও আইন ছিল। এর পাশাপাশি গোত্রে গোত্রে যোগাযোগ, দ্বন্দ্ব, এমনকি যুদ্ধ এ অঞ্চলের জন্য স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে।
এ সময়ে বেদুইনরা সমগ্র আরব ভূমিতে বিস্তৃত ছিল। তাদের অস্থায়ী বসতি মূলত জলসত্রসহ মরুদ্যানের লভ্যতার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠত। গোত্রভিত্তিক দ্বন্দ্বের একটি অন্যতম কারণ পানির অধিকার লাভ। তবে এ মরুদ্যান ব্যবস্থার বাইরে উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলে সাসানিয় ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আনুকূল্যে স্থায়ী বসতি স্থাপিত হয়। এছাড়া নজদ অধিত্যকায় কিন্দা সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। বিস্তৃত এ অঞ্চলের বাইরে ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনেও বেদুইন বসতি ছিল। বর্তমান সৌদি আরব ও সংলগ্ন এলাকার বেদুইন জনগোষ্ঠী নিজেদের আদি উৎস সম্পর্কে দুটি দাবি করে। প্রথমত, দক্ষিণের ইয়েমেনিরা বলে তারা কাহতানের উত্তরসূরি। উত্তর ও মধ্য আরবের ‘কায়েসি’দের দাবি তারা হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর। তবে বংশধারা যারই হোক না কেন সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত বেদুইনরা আরব উপদ্বীপ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। লোহিত সাগরের অন্য দিকে আফ্রিকা উপকূলে তারা কেউ কেউ পাড়ি দিয়েছিল, কিন্তু বেদুইন নামটি এবং বেদুইনরা মূলত ইসলাম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে পরিচিতি লাভ করে। কেবল পরিচিতি নয়, তাদের বাসস্থানও বদলে যায়।
বেদুইনরা স্বভাবযোদ্ধা। পশু পালনের পাশাপাশি তারা সৈনিক হিসেবে নানা সাম্রাজ্যের অধীনে লড়াই করত। মজার ব্যাপার, যাযাবর হলেও বেদুইনরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সমুদ্র বাণিজ্যে জলদস্যুদের ভয় থাকার কারণে আরবের স্থলপথ ধরে বহু বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াত করত। প্রাচীনকালের মতো কর সংগ্রহের পাশাপার্িশ এ সময়ে আরবের গোত্রগুলো বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া এ কালের মতো মক্কা, মদিনা, জেরুজালেম তখনো পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য হতো। আরবেরই নানা অঞ্চল থেকে তীর্থযাত্রীদের আগমন ঘটত মক্কায়। ব্যবসা কিংবা ভূমির অধিকার নিয়ে বেদুইনদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পাশাপাশি বহিঃশত্রুর আক্রমণও হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা সাক্ষ্য দেয়, বেদুইনরা ঐক্যবদ্ধ ছিল না। ইসলামের আগমনের পর, বিশেষত উমাইয়া খেলাফতের সময়ে গোত্রগুলোকে খেলাফতের অধীনে তথা খলিফার শাসনে আনা হয়।
বেদুইনদের ইতিহাসের রাজনৈতিক দিক লক্ষ করতে গেলে কিছুটা মুশকিলে পড়তে হয়। কেননা প্রথম দিকে তাদের বসবাস এবং কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। গোত্রভিত্তিক জীবনযাপন এবং গোত্রপ্রধানের প্রাধান্য ব্যতীত সেখানে কোনো রাজনীতি-চিন্তা ছিল বলে মনে হয় না। ইসলামের প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে বিজয় অভিযান শুরু হলে বেদুইনরা এ দলে যোগদান করে আরব ভূমি থেকে ভিন্ন অঞ্চলে গমন করে। পাশাপাশি অধিকৃত ভূমিতে কখনো কখনো তাদের বসবাসের অধিকার দেয়া হয়। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পাশাপাশি অধিকারে ভূমি আসার কারণে তারা সে ভূমিতেই স্থায়ী বসবাসের চিন্তা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনীতি। মিসরীয় স্তেপে খারেজিদের সহায়তা করার মধ্য দিয়ে শাসনক্ষমতা বা রাষ্ট্রীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাবনা লোপ পায়। উমাইয়া শেষ হয়ে আব্বাসীয় খেলাফত শুরু হলে নীতিতে নানা পরিবর্তন আসার কারণে এক ধরনের অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
ইসলামের সূচনার আগে থেকেই আরবে নগর গড়ে উঠতে শুরু করে। ইসলামের আগমনের পর তা বেগবান ও সমৃদ্ধ হয় এবং বিজয় অভিযানের মাধ্যমে আরবের প্রাধান্য ও শক্তি নানা অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে। এর সঙ্গে সঙ্গে হেজাজ (মক্কা, মদিনা, জেদ্দা, তাবুক, ইয়াবু ও তায়েফ) এবং নজদের অনেকাংশে নগর গড়ে উঠেছিল। ফলে আব্বাসীয় খেলাফত শুরুর বেশ আগেই আরবের রাজনীতি নগরকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং যাযাবর গোষ্ঠীর প্রয়োজনীয়তা কমতে শুরু করে। প্রাক-ইসলামী কাল থেকে খেলাফতের শুরুর দিকেও বেদুইন যোদ্ধারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন লাভ করত কিন্তু আব্বাসীয় খেলাফতের সময়ে নগরকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বেদুইনদের প্রয়োজনীয়তা কমতে শুরু করে। এগুলো একদিনে হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অবহেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসন্তোষ বাড়ে এবং হেজাজ অঞ্চলে একাধিক দাঙ্গা ও আক্রমণের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পায়।
নবম শতাব্দীর শেষাংশে বেদুইন ইতিহাস নতুন মোড় নেয়। খেলাফত ক্রমেই দুর্বল হতে শুরু করে এবং ছোট ছোট অংশে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। এ সময়ে বেদুইনদের কার্যক্রম পাঁচটি অংশ থেকে পরিচালিত হতো বা পাঁচটি ভিন্ন অঞ্চলে এর কেন্দ্র তৈরি হয়—আরব উপদ্বীপ অঞ্চল; খোরাসান; সিনাই উপদ্বীপ অঞ্চল; মিসর, উত্তর নুবিয়া ও উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা। কিন্তু এদের আন্তঃসম্পর্ক সেভাবে ছিল না। এক্ষেত্রে বনু হিলাল ও সুলায়মের মিসর থেকে মাগরেবে (পশ্চিম আফ্রিকার নির্দিষ্ট অঞ্চল) অভিবাসন একমাত্র ব্যতিক্রম। কালপর্বটি দ্রুত এবং বড় আকারের অভিবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এমন এক অভিবাসনের মাধ্যমে বেদুইনরা নজদ থেকে জাজিরায় হাজির হয়। এরপর স্থানীয় গোত্রগুলোর সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ গোত্রগুলো ছিল অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা এবং সামরিক শাসনের অধীন। এ ঘটনার সঙ্গে আলেপ্পোর যুবরাজ সাইফুদ্দিন আল হামদানি (শাসনকাল ৯৪৪-৯৬৭ খ্রি.) যুক্ত ছিলেন। আরেক দিকে বনু তায়ি নজদ থেকে ফিলিস্তিনের দিকে গমন করে। পূর্ব আরবের আবু সাইয়িদের শাসনাধীনে থাকা কায়েসিরা ইরাকে অভিবাসী হয়। কেবল সিরিয়ার স্তেপে বনু কালবের অধীনে বাদিয়াত-আল-শাম স্থিতিশীল ছিল। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে এ অভিবাসন প্রক্রিয়া স্তিমিত হতে শুরু করে।
কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। ৯০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেদুইনদের ওপর ইসমাইলিদের প্রভাব কমে আসে। ৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায় ইসমাইলি অভিযানের মাধ্যমে বেদুইন বিদ্রোহ শুরু হয়। এর মাধ্যমে গোত্রগুলোর মধ্যে বহিরাগত আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের মৈত্রী তৈরি হয়। এমনকি ৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ইসমাইলি-বেদুইন রাষ্ট্রও গঠিত হয়। মধ্য সিরিয়ার হামকে ক্ষণস্থায়ী এ রাষ্ট্রের রাজধানী করা হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ৯০৭ খ্রিস্টাব্দের পর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। এ ধারাবাহিকতায় ‘কারমাতিয়া’ নামে আরেকটি ইসমাইলি বিদ্রোহ হয়েছিল। আবু সাইয়িদ বংশের বিরুদ্ধে সংঘটিত এ বিদ্রোহ বেদুইন সমাজ, রাজনীতি, নেতৃত্ব ও জীবন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। বিদ্রোহীদের লক্ষ্যস্থল ছিল মূলত পূর্ব ও মধ্য আরব এবং ৯২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মক্কায় ধারাবাহিক আক্রমণ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। তবে ৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় ন্যক্কারজনক আক্রমণ হয়। নয় বছর ধরে নানা আলোচনা করে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
বেদুইন প্রাধান্য এক ধরনের বহির্মুখী চাপ প্রয়োগ করে, ফলে রাষ্ট্রের আলাদা করে নিরাপত্তা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে অভিবাসনের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা ভরাট করার প্রয়োজন থেকে বেদুইনদের ডেকে আনা হয়েছিল। এতে পুনরায় অভ্যন্তরীণ একটি চাপ তৈরি হয়। ক্ষমতা দখলের জন্য হতে থাকে নানা রকম ষড়যন্ত্র। তবে শাসনক্ষমতা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে বেদুইন গোত্রগুলোর গঠন এবং কার্যপ্রণালিতেও পরিবর্তন আসে। ১০২১-২৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে আরব-ইসলামিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। একটি ত্রিপক্ষীয় মৈত্রীর মাধ্যমে সিরিয়া থেকে ফাতেমি খেলাফত উচ্ছেদ করে তিন পক্ষের মধ্যে তা বণ্টন করে দেয়ার চুক্তি হয়। এর মাধ্যমে বৃহৎ রাষ্ট্র ভেঙে পুনরায় গোত্রশাসিত রাজ্যে ফিরে যাওয়ার চিন্তা পরিলক্ষিত হয়।
সেলজুক সাম্রাজ্য আরব ও বেদুইনদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এ তুর্কমানরা মূলত ঘোড়া প্রজননকারী হিসেবে আরবে আগমন করে। এরা তৃণভূমি ও মরুভূমির মধ্যে বসতি স্থাপন করে বসে, ফলে প্রজনন সহকারী স্থানীয় লোকজনের পেশায় প্রভাব পড়ে। এরপর ক্রমাগত সেলজুকরা ক্ষমতা বিস্তার করা শুরু করলে আরব এবং বেদুইনদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। সেলজুক সাম্রাজ্য বাড়তে শুরু করলে আরবে তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে এবং একটা সময়ে অবস্থা এমন হয় যে বেদুইনরা কেবল সেলজুকদের সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবেই জায়গা লাভ করত। তবে এ সময়ের আগে-পরে আরবের সঙ্গে আরবের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বেদুইনরা একীভূত হয়।
ইতিহাসের পরবর্তী নানা কালপর্বে বেদুইনদের সমাজ, জীবন ও শাসন নানাভাবে পরিবর্তিত হয়। নজদ ও আরব উপদ্বীপের সঙ্গে সিরীয় বেদুইনরা যুক্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আইয়ুবিদের হটিয়ে যখন মামলুকরা ক্ষমতায় এল তারা এ বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু মিসরে ভিন্ন ঘটনা দেখা যায়। ১২৫০ নাগাদ মামলুকরা ক্ষমতায় এলে বেদুইন ও মামলুকদের মধ্যে ভয়ানক একটি যুদ্ধ হয়। কিছু বেদুইন গোত্র স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। অন্যদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রের তুলনায় মানুষের সঙ্গে তাদের সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মিসরে সিরিয়ার তুলনায় বেশি স্থানান্তর দেখা যায়। তবে এ সময়ের মধ্যে একটি বিশেষ ঘটনা লক্ষ করা যায়। পরবর্তী আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হয়ে ওঠে বহির্ভাগের তৃণভূমি। কিপচাক ও মোঙ্গল আক্রমণের সময় (১৪০০-০১ খ্রি.) আরবের মধ্যভাগ ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
অটোমান সুলতান সুলেমানের শাসনামলে (১৫২০-৬৬ খ্রি.) তাকে একজন সামরিক নেতা থেকে প্রশাসনের প্রধান হয়ে উঠতে দেখা যায়। তার এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বেদুইনদের ওপর প্রভাব ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। এ সুযোগে ভেঙে যাওয়া বেদুইন সম্পর্ক (যদিও কখনো একীভূত সম্পর্ক ছিল না, যা দ্বারা বেদুইন-রাষ্ট্র তৈরি করা সম্ভব হয়) আবার ঘনীভূত হওয়া সম্ভবপর হয়। মূলত ১২৫০-৫৮, ১৩৮২, ১৪০০-০১ সময়ে আরব অঞ্চল নানা শক্তির অধীনে আসে এবং এ পরিবর্তনগুলো বেদুইন সমাজ, প্রশাসন, সংস্কৃতি, রাজনীতি প্রভৃতির ওপর প্রভাব ফেলেছিল। একাদশ-পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ ধরনের পরিবর্তনের কারণে ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি সব বেদুইন ব্যবস্থায় ক্রমাগত পরিবর্তন এসেছিল।
সতেরো শতকের মধ্যবর্তী সময়ে নজদ থেকে পূর্ব আরবে আগমন এবং আঠারো শতকের শুরুতে সিরিয়ার উর্বর ভূমি ও ইরাকি মরুভূমিতে আনজা ও শামার গোত্রের লোকদের আগমন এ অঞ্চলের বেদুইনদের জনমিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এ অভিবাসীদের কারণে সিরিয়ান তায়ি, মাওয়ালি ও অন্যান্য গোত্রের মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমে যায়। এ সময় থেকেই ইউরোপীয়রা আরবের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে শুরু করে। আগ্রহ অবশ্য আগেও ছিল, কেননা প্রাচীন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়ে আরবে তার প্রভাব বিস্তার করেছিল। বলা হয়, আরবে নানা সময়ে খ্রিস্টান আক্রমণের (যেমন আবরাহার আক্রমণ) নেপথ্যে প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে ইউরোপের প্রভাব ছিল। সেটা সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমে না হলেও ধর্মের মাধ্যমে হয়েছিল।
আরব উপদ্বীপে ইউরোপীয় আগ্রহ বাড়লে সেখানে বেদুইন প্রতিনিধিত্ব বাড়ে। আল নূরী ইবনে সা’লান ফরাসি ম্যান্ডেটে আমিরের মর্যাদা লাভ করলেও তিনি গোত্রভিত্তিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করেননি। তিনি ভ্রাম্যমাণ উট পালন থেকে শুরু করে পুরনো নানা প্রথা চালু রাখেন। ১৯০০-১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কিছু কিছু বেদুইন গোত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুরূপ নিয়মে চললেও তারা নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে যায়নি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যেসব গোত্র কোনো না কোনো সময়ে রাষ্ট্র গঠন বা গঠনের চেষ্টা করেছিল, তারা তাদের গোত্র ব্যবস্থার প্রায় সূচনাকাল থেকেই স্থায়ী কিংবা অন্য যাযাবর গোত্রের তুলনায় বেশি সময় ধরে এক স্থানে বসতি স্থাপন করে বসবাস করত।
খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার অব্দ থেকে বেদুইনরা যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত। পরবর্তী সময়ে অভিবাসন, বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রভৃতির মধ্যেও তারা এ যাযাবরজীবন ধরে রেখেছিল। বিংশ শতাব্দীতে এসে বৈশ্বিক পরিবর্তন, পুঁজিবাদের বিকাশ এবং প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বেদুইনরাও ক্রমে থিতু হতে বাধ্য হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েছে পুরনো বুনো উদ্যম, উদ্দাম জীবন এমনকি যুদ্ধ করার স্পৃহা। অনেকে বলে থাকেন, থিতু হওয়ার মধ্য দিয়ে বেদুইনদের ক্ষতি হয়ে গেছে। বেদুইনদের থিতু হওয়ার এ ধারা মূলত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরবেও এর প্রভাব পড়ে। প্রথমে লীগ অব নেশনস এবং পরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আরবের রাজনীতি বদলে যায়। এর মধ্যে বেদুইনদের স্বায়ত্তশাসন, বলা চলে আরব দেশগুলোর স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। ফলে বেদুইন গোত্রগুলো বর্তমানে সৌদি আরব, ইয়েমেন, ইরাক, কুয়েতের অধীন। তবে এখনো কোনো কোনো অঞ্চলে বেদুইনরা তাদের পুরনো যাযাবরজীবন, রীতিনীতি ধরে রেখেছে। সেসব অঞ্চলের আবহাওয়ায় এখনো হয়তো দুরন্ত জীবনের আহ্বান ভাসে।



