পৌরসভার তথ্যভান্ডার ডিজিটাল করার উদ্যোগ: তথ্য দিতে আগ্রহ কম মেয়রদের!
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশের ৩২৮টি পৌরসভায় স্থায়ী কর্মীর চেয়ে অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পৌরসভাগুলোতে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ বন্ধ করতে বলা হলেও সেটি মানা হচ্ছে না। রাজস্ব আয় কম হলেও মেয়ররা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন। অন্যদিকে দুই শতাধিক পৌরসভায় কর্মীদের বেতন-ভাতা ২ থেকে ৭০ মাস পর্যন্ত বকেয়া। বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৮৭৫ কোটি টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে পৌরসভার কাজে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল তথ্যভান্ডার করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণারয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। পৌরসভার আয়-ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে গত দেড় বছরে পাঁচ দফা চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু তথ্য দিতে পৌর মেয়রদের আগ্রহ কম।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের সব পৌরসভার আধুনিক তথ্যভান্ডার করার লক্ষ্যে ‘পৌরসভা রিসোর্সেস অ্যান্ড অফিস এমআইএস ফর ই-গভর্নমেন্ট (প্রমিস)’ শীর্ষক একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই সফটওয়্যারে হালনাগাদের জন্য ২০২০ সালের আগস্টে পৌরসভার জনপ্রতিনিধিসহ স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪৮টি পৌরসভার তথ্য পাওয়া যায়নি। আর যেসব পৌরসভা তথ্য দিয়েছে তারাও অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (পৌর-১) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, পৌরসভাগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার জন্যই এই সফটওয়্যারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে।
তিনটি পৌরসভার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তথ্য দেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি মেয়রের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। পৌর সচিব বা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের তথ্য দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। তথ্য না দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি নেই। বরং কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বকেয়া, তাঁরা এই বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সামনে তুলে আনতে চান। যেসব পৌরসভার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোর মেয়রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
টাঙ্গাইল পৌরসভার সচিব শাহনেওয়াজ পারভীন বলেন, জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে তথ্য আগে পাঠানো হয়েছিল। গত ১০ ফেব্রুয়ারির চিঠি পাওয়ার পর বেতনসংক্রান্ত তথ্য ও গত তিন বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য গোছানো হচ্ছে। তিনি বলেন, সফটওয়্যার ব্যবহার করার বিষয়ে তাঁরা কোনো প্রশিক্ষণ পাননি।
যেসব পৌরসভা তথ্য দেয়নি এর মধ্যে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভা একটি। এই পৌরসভায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া ৪০ মাস। পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামান গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পৌরসভার আয়-ব্যয় ও বেতন-ভাতা বকেয়ার তথ্য পাঠানোর বিষয়ে কোনো চিঠির বিষয়ে জানা নেই। চিঠি পেলে তথ্য পাঠাতে সমস্যা নেই।’
ভোলার লালমোহন পৌরসভাতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েক মাসের বেতন বকেয়া। লালমোহনের মেয়র ইমদাদুল হক বলেন, বেশ কিছু তথ্য গোছানো হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে হালনাগাদ তথ্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
গত বছরের ১৬ জুন পৌরসভাগুলোকে দেওয়া চিঠিতে নির্দিষ্ট সময় পরপর আয়-ব্যয়ের ত্রৈমাসিক তথ্য পাঠাতে নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর এক দিন পরই পৌরসভাগুলোকে আরেকটি চিঠি দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। ওই চিঠিতে পৌরসভার স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, আনুতোষিকসহ অন্যান্য তথ্য পাঠাতে বলা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক তথ্য না পাওয়ায় পৌরসভার বরাদ্দ ও বেতন-ভাতাবিষয়ক সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের পাঠানো সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়, চিঠির নির্দেশ পালনে ব্যর্থতা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট পৌর সচিব, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষক দায়ী হবেন। পৌর মেয়রদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনুমতিপত্র প্রদান এবং পৌরসভায় বরাদ্দসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ছাড়ের ক্ষেত্রে তথ্য হালনাগাদ দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
পৌরসভার মেয়রদের সংগঠন মিউনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও নীলফামারী পৌরসভার মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ বলেন, সব পৌরসভা থেকে যাতে হালনাগাদ তথ্য দ্রুত পাঠানো হয়, সে জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে সব মেয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
সূত্র: প্রথম আলো



