গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : এসএসসি পরীক্ষার কয়েকদিন আগেই হারান বাবাকে, পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে অভাব-অনটন তখন নিত্যসঙ্গী। বাধ্য হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক শেষেই কনস্টেবল হিসেবে পুলিশে যোগ দেন আব্দুল হাকিম। আর সেখানকার এক রাতের ডিউটি থেকে চেপে বসা জিদ আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমে তিনি এখন এএসপির খাতায় নাম লেখাতে চলেছেন।
বুধবার প্রকাশিত ৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে পুলিশ ক্যাডারে (এএসপি) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন আব্দুল হাকিম। কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেওয়া হাকিম অবশ্য এখন নায়েক হিসেবে আছেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এর আগে তারা কনস্টেবল বা নায়েক পদের কারও এমন চাকরি পাওয়ার কথা শোনেননি। হাকিমের অভাবনীয় সাফল্য তারা খুবই উচ্ছ্বসিত।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ফোনে কথা হচ্ছিল পুলিশের স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) নায়েক আব্দুল হাকিমের সঙ্গে। শুরুতেই বললেন, “ভাই, সবার ফোন ধরতেও পারছি না। অনেক চ্যানেল থেকে সাংবাদিক ভাইয়েরা ফোন করছেন। ইন্টারভিউ নিতে চাচ্ছেন।”
তারকা বনে যাওয়া হাকিমকে নিয়ে সবাই এখন কৌতূহলী। চাকরিরত অবস্থায় কী করে বিসিএসের মতো ‘যুদ্ধ’ উতরে গেলেন- সেই প্রশ্নের উত্তরে হাকিমের কণ্ঠে ভেসে আসছিল বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার গল্প।
তিনি জানালেন, বাবা ছিলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা। ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষার কয়েকদিন আগে তিনি মারা যান। শোক আর কষ্ট নিয়ে কোনোরকম পরীক্ষার সিটে বসতে হয়েছিল। ফলও তেমন ভাল হয়নি। এরপর টানাটানির সংসারে পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ ছিল না।
“বাবার মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা, তিনজনের প্রাপ্য রেশন আর বড় ভাইয়ের সামান্য আয়ে কোনো রকমে চলছিল পাঁচ ভাই-বোন আর মাকে নিয়ে বিশাল সংসার। এই অবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই ২০১৩ সালে পুলিশ কনস্টেবল পদে আবেদন করি। চাকরিটা মিলেও যায়।”
চাকরি পেয়ে থেমে যাননি তিনি, চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।

হাকিম বলেন, “প্রথমে পোস্টিং হলো গাজীপুরে শিল্প পুলিশে। শিল্প পুলিশে ডিউটি একটু কমই ছিল। দেখা যায় যে কয়েক ঘণ্টা ডিউটি করলে বাকি সময়টায় কোনো কাজ থাকে না। সেই সময় ভর্তি হয়ে গেলাম নরসিংদী সরকারি কলেজে। ডিউটির ফাঁকে অবসর সময়টা পুরোপুরি লাগালাম পড়াশোনার কাজে। ২০১৬ সালে নরসিংদ সরকারি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করলাম।”
স্নাতক সম্পন্ন করাটা সহজ ছিল না হাকিমের জন্য। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, “২০১৫ সালে পোস্টিং হয়ে গেল ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি)। পোস্টিং ছিল পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) বিভাগে। মিরপুরের পিওএম ব্যারাকে থাকতাম।
“শিল্প পুলিশ থেকে ডিএমপিতে এসে ডিউটি বেড়ে গেল অনেক। লাইফ আগের চেয়ে অনেক হার্ড হয়ে গেল। প্রতিদিন ডিউটি করতে হয়।”
মশার কামড়ের এক রাত
আবদুল হাকিম বলেছিলেন, “ডিএমপিতে আসার পর নানা জায়গায় ডিউটি করতে হত। এতো হার্ড ডিউটি আগের তিন বছরের শিল্প পুলিশের চাকরিতে আমি কখনোই পাইনি। তখন আমার গ্রাজুয়েশন লাস্ট ইয়ার (২০১৫ সাল) চলছিল। একদিন ডিউটি পড়ল আমিন বাজার সেতুর নিচে, গাবতলী এলাকায়।
“…ওখানে এত মশা কামড়াচ্ছিল, সারারাত যে কীভাবে কাটল! তখনই মনস্থির করে ফেললাম যে এভাবে পুলিশ কনস্টেবলের চাকরিতে থেমে থাকা যাবে না। আরও পড়াশোনা করতে হবে। পুলিশেরই ভালো কোনো পদে বা অন্য ভালো কোনো চাকরি করতে হবে। আমার শিক্ষকতা করার ইচ্ছে ছিল।”
স্নাতক সম্পন্ন করে পদোন্নতি পেয়েছিলেন হাকিম। কিন্তু সেই রাতের জিদ তখন কাটেনি। হাকিমের কথায়, “পিওএম থেকেই গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে ফেললাম। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরই আমার নায়েক র্যাংক লাগল। নায়েক র্যাংক পাওয়ার পর পোস্টিং হল স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়নে। সেখানে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ ছিল।
“তখন ডিউটির পাশাপাশি ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা শুরু করলাম। রাত ২টা পর্যন্ত পড়তাম। আবার সকাল ৭টায় যখন রোলকল হতো, তখন আমার ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা। মাঝে মাঝে রোলকলের দায়িত্বে থাকা এএসআই বকতেন। কিন্তু তখন আমার রোগ চেপে গেছে। এই চাকরিতে থাকলে চলবে না, আরো অনেকদূর যেতে হবে।”
স্বাস্থ্যের চাকরিটা পেয়েও করা হল না
এরমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চাকরির জন্য আবেদন করেন আব্দুল হাকিম। পরীক্ষা দেওয়ার পর চাকরিটা হয়েও যায়। কিন্তু পুলিশের চাকরি থেকে অন্য চাকরিতে যেতে যে বিভাগীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তা নেওয়া ছিল না হাকিমের।
সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে হাকিম বলেন, “ওই চাকরির পরীক্ষাটা আমি দিয়েছিলাম কেবল নিজের যোগ্যতা যাচাই করার জন্য যে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমি পারবো কি না? চাকরিটা না করতে পেরে আমার মন খারাপ হয়নি। বরং মনোবল আরও বেড়ে গিয়েছিল যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় আমি পারব।”
৪০তম বিসিএসে আবেদন
পূর্ণ মনোবল নিয়েই ২০১৮ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনে আবেদন করেন আব্দুল হাকিম। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মনোবল আরও অনেক বেড়ে যায়। হাকিম বলছিলেন, “তখন সব ছেড়েছুড়ে লাগার পালা। আমাদের সহকর্মীরা ভিআইপিদের সঙ্গে অনেক ডিউটি করতেন। অনেক রাত করে তারা ফিরতেন।
“তাদের বলে আমি রেগুলার ডিউটি নিয়েছিলাম। তাদের বলতাম যে, ভাইয়া এই কয়টা দিন আমার পড়াশোনার চাপ, আপনারা ভিআইপি ডিউটি করেন, আমি রেগুলার ডিউটি করি।’”
ফাঁক পেলেই ব্যারাকে বইপত্র নিয়ে বসে পড়তেন জানিয়ে হাকিম বলেন, “প্রটেকশন ব্যাটালিয়নে থাকার কারণেই ওই সময় পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পেরেছি। বিসিএসের রিটেন (লিখিত) পরীক্ষার আগ পর্যন্ত প্রটেকশন ব্যাটালিয়নেই থাকলাম। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পোস্টিং হয়ে গেল গুলশানে ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি জোনে।”
ওই বছরের শুরুতেই মাকে হারান হাকিম। এর পরও পড়াশোনার গতি থামেনি। হাকিম বলছিলেন, “গুলশানে পোস্টিং থাকা অবস্থাতেই ভাইবাটা দিলাম। গত বছরের ২৩ মার্চ আমার ভাইভা হল। আর ৩০ মার্চ থেকে করোনার কারণে ভাইভা পরীক্ষা স্থগিত করলো পিএসসি। একবারে পরীক্ষা দিতে না পারলে আমার জন্য খুবই সমস্যায় পড়তে হতো। ভাগ্য ভালো যে আগেই পরীক্ষাটা দিতে পারলাম।”
যেভাবে পড়াশোনা
হাকিমের ব্যারাক ছিল ঢাকার বঙ্গবাজার এলাকায় (আব্দুর গণি রোডে)। সেখান থেকে নিয়মিত হেঁটে হেঁটে নীলক্ষেতে গিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি বই কিনতেন তিনি। তিনি বলেন, “নীলক্ষেত থেকে ছোট ছোট চটি বইগুলো কিনতাম। আবার প্রতি মাসের চলতি ঘটনাগুলো নিয়ে যে ম্যাগাজিনগুলো বের হত, সেগুলোও কিনতাম।
“আর ফেইসবুকে বিসিএস প্রস্তুতির কয়েকটি গ্রুপ ফলো করতাম। সেখান থেকে অনেক কিছু পাওয়া যেত। আমি সবগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম।”
যতটুকু সময় পেয়েছেন, সবটুকুই পড়াশোনাতে কাজে লাগিয়েছেন হাকিম। বলছেন, সব সয়ে পরিশ্রম করে যাওয়াতেই ধরা দিয়েছে সাফল্য।