কালীগঞ্জে রিয়াজ উদ্দিনকে হত্যার পর খুনিরাই লাশ নিয়ে যায় হাসপাতালে: পিবিআই

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : প্রায় দুই বছর আগে কালীগঞ্জের ‘ছাইফ এগ্রোফার্মের’ কর্মচারী রিয়াজ উদ্দিনকে (৪০) হত্যার পর খুনিরাই লাশ নিয়ে যায় হাসপাতালে গিয়েছিল। এছাড়াও রিয়াজ উদ্দিন পানিতে ডুবে মারা গেছে বলে প্রচার করে হত্যাকারীরা।

কিন্তু কালীগঞ্জ থানা পুলিশ ৩ মাস তদন্ত করেও চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা উদঘাটনে ব্যর্থ হয়ে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল করে। পরে আদালত স্বপ্রনোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) গাজীপুর জেলা শাখাকে নির্দেশ দেন।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই বছর পর গত ৬ জুন জড়িত তিন আসামিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) গাজীপুর জেলা শাখা।

বুধবার (০৮ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান।

নিহত রিয়াজ উদ্দিন কালীগঞ্জের জামালপুর (হাজীপাড়া) গ্রামের নাজিমের ছেলে।

গ্রেপ্তার আসামীরা হলো, নরসিংদী সদর থানার দক্ষিন পুরানপাড়া এলাকার ফাইজ উদ্দিন মিয়ার ছেলে আজিজুল হক (২০), একই এলাকার হিরু মিয়া ভাসানীর ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩৯) এবং একই শিবপুর থানার সৈয়দনগর এলাকার সফিকুল ইসলামের ছেলে আবির (১৬)। হত্যার শিকার রিয়াজ উদ্দিন ও গ্রেপ্তারে আসামীরা সকলে কালীগঞ্জের ফুলদি ‘ছাইফ এগ্রোফার্মের’ রাখাল হিসেবে কাজ করত।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পিবিআই জানায়, ২০২০ সালের ২৮ জুন (রোববার) বিকেল ৪টার দিকে ফুলদী গ্রামে অবস্থিত ‘ছাইফ এগ্রোফার্মের’ পার্শ্ববর্তী একটি বিলের পানি থেকে হাঁস আনতে গিয়ে রিয়াজ উদ্দিন সাঁতার কাটা অবস্থায় পানিতে ডুবে মারা যায়। পানি থেকে তার সহকর্মীরা তাকে বিলের পানির থেকে উঠিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক রিয়াজ উদ্দিনকে মৃত্যু ঘোষণা করেন। পরে কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদের অভিযোগের ভিত্তিতে অপমৃত্যু মামলা করে (মামলা নং-২০, তারিখ-২০/০৭/২০২০) লাশ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাপাতলে পাঠায় পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে প্রতিবেদনে চিকিৎসক উল্লেখ করে, মাথায় আঘাতের কারণে রিয়াজ উদ্দিন মারা যায়।

পরবর্তীতে রিয়াজ উদ্দিনের পিতা নাজিম উদ্দিন অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা মামলা দায়ের করেন [মামলা নং-১৪ (০২)২১]।

কালীগঞ্জ থানা পুলিশ ৩ মাস তদন্ত করেও চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা উদঘাটনে ব্যর্থ হয়ে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল করে। পরে আদালত স্বপ্রনোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) গাজীপুর জেলা শাখাকে নির্দেশ দেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পিবিআই আরো জানায়, পিবিআই’র প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম (বার), পিপিএম-এর তত্ত্বাবধান ও দিক নির্দেশনায় পিবিআই গাজীপুর ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমানের সার্বিক সহযোগীতায় মামলাটি মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই’র উপপরিদর্শক (এসআই) জামাল উদ্দিন।

তদন্তের একপর্যায়ে পিবিআই গাজীপুরের একটি টিম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান পরিচালনা করে মামলার ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আসামী আজিজুল হক গত ৬ জুন দিবাগত রাত্র দেড়টার দিকে কালীগঞ্জের ফুলদী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তার দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একই রাত্ পৌণে ৪টার দিকে নরসিংদী সদর থানাধীন দক্ষিন পুরান পাড়া এলাকা হতে ঘটনার মূল আসামী ইয়াছিন মিয়া গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দুই আসামীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ঘটনার সাথে জড়িত আবিরকে নরসিংদীর কেশিবপুর সৈয়দ নগর এলাকা থেকে ৭/ জুন ভোর ৫টা দিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার আসামীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় গ্রেপ্তার আসামী ইয়াসিন মিয়া, আজিজুল হক ও আবিরসহ ভিকটিম রিয়াজ উদ্দিন কালীগঞ্জের ফুলদী গ্রামে অবস্থিত ছাইফ এগ্রোফার্মে রাখাল হিসেবে কাজ করত। তাদের মধ্যে ইয়াসিন মিয়া ফার্মে দুধ বিক্রি থেকে শুরু করে ফার্মের যাবতীয় কাজ করত। ইয়াছিন আলী প্রতিদিন ফুলদী বাজারে ছাইফ এগ্রোফার্মের দুধ বিক্রি করত এবং দুধ বিক্রির টাকা থেকে প্রতিদিন ১০০/১৫০ টাকা গোপনে রেখে দিত। ইয়াসিন একদিন ভিকটিম রিয়াজ উদ্দিনকে নিয়ে দুধ বিক্রি করতে গেলে রিয়াজ উদ্দিন টাকা রাখার বিষয়টি জেনে যায়। তারপর থেকে রিয়াজ উদ্দিন ইয়াসিন মিয়ার চুরি করা টাকার অর্ধেক ভাগ চায়। টাকার ভাগ না দিলে রিয়াজ উদ্দিন ফার্মের মালিককে জানিয়ে দিবে বলে ইয়াসিন মিয়াকে হুমকি দেয়। ঘটনার অনুমান ২ দিন আগে এ নিয়ে রিয়াজ এর সাথে ইয়াসিনের ঝগড়া হয়। ঘটনার দিন দুপুরে গোসল করার সময় গ্রেপ্তার আসামীর রিয়াজ উদ্দিনকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন ২০২০ সালের ২৮ জুন আনুমানীক বিকেলে ৪টার সময় ইয়াসিন মিয়াসহ অন্যান্য আসামীরা রিয়াজ উদ্দিনকে সাথে নিয়ে বিলে হাঁস আনার জন্য যায়। সে সময় দুইজন বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। আর কিছুদুর যাওয়ার পর ইয়াসিন মিয়ার হাতে থাকা কাঠের লাঠি দিয়ে ভিকটিম রিয়াজ উদ্দিনের মাথায় ৩/৪টা আঘাত করে এতে রিয়াজ উদ্দিন পানিতে ডুবে যায়। পরে ইয়াসিন তার সহযোগী আজিজুল ও আবিরের কাছে ফিরে আসে এবং তারা ৩ জন ফার্মে থাকা সিকিউরিটি গার্ড ও অন্যান্য লোকদের কাছে প্রচার করে যে রিয়াজ উদ্দিন পানিতে ডুবে গিয়াছে। পরবর্তীতে ঘটনায় জড়িত ইয়াসিন মিয়া ও অন্যান্য লোকজন বিলের পানিতে গিয়া রিয়াজ উদ্দিনকে বিলের পানির নিচে থেকে উদ্ধার করে। পরে ইয়াসিন মিয়া ও আজিজুল হক কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিলে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রিয়াজ উদ্দিনকে মৃত্যু ঘোষণা করেন।

পিবিআই’র পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, রিয়াজ উদ্দিনের বাড়ি কালীগঞ্জের জামালপুরে। সে পার্শ্ববর্তী ফুলদি এলাকায় ছাইফ এগ্রোফার্মে রাখাল হিসেবে কাজ করতো। ঘটনায় জড়িত আসামী ইয়াসিন মিয়াসহ অপর আসামীদের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। তারাও একই ফার্মে রাখাল হিসেবে কাজ করত। আসামী ইয়াসিন মিয়া ফার্মের দুধ বিক্রসহ যাবতীয় কাজ দেখাশুনা করত। দুধ বিক্রয় করে প্রতিদিন কিছু টাকা আসামী ইয়াসিন চুরি করত। ভিকটিম রিয়াজ উদ্দিন বিষয়টি জানতে পেরে মালিক পক্ষকে জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে আসামীরা ভিকটিককে হত্যার পরিকল্পনা করে। ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে ভিকটিম রিয়াজ উদ্দিনকে সুকৌশলে ফার্ম সংলগ্ন বিলের মধ্যে হতে হাঁস আনার জন্য ড্রাম নিয়ে সাঁতার দিয়ে অনুমান ২০০ গজ যাওয়াার পর আসামী ইয়াসিনের হাতে থাকা কাঠের লাঠি দিয়ে রিয়াজ উদ্দিনের মাথায় ৩/৪ টি বারি দিলে রিয়াজ উদ্দিন পানিতে ডুবে যায়। তখন ইয়াসিন ফার্ম সংলগ্ন বিলের পাড়ে দাঁড়ানো অপেক্ষমান তার সহযোগীদের কাছে ফিরে এসে রিয়াজ উদ্দিন পানিতে ডুবে গেছে বলে প্রচার করে। ইয়াসিন পূনরায় ফার্মের সিকিউরিটি গার্ড ও কাঠ মিস্ত্রিকে নিয়ে পানির মধ্যে হতে রিয়াজ উদ্দিনকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক রিয়াজ উদ্দিনকে মৃত্যু ঘোষণা করেন। মূলত প্রতিদিন দুধ বিক্রির টাকা হতে টাকা চুরি করার বিষয়টি জানতে পেরে উক্ত টাকার ভাগ চাওয়ায় ভিকটিম রিয়াজ উদ্দিনকে হত্যা করে হত্যাকারীরা পানিতে ডুবে রিয়াজ উদ্দিন মারা গেছে বলে প্রচার করে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান আরো বলেন, আসামী ইয়াছিন মিয়া, আজিজুল হক ও আবিরকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৭ জুন আদালতে সোপর্দ করা হলে আসামী নিজেদেরকে রিয়াজ উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে এবং ঘটনার সাথে জড়িত অপর আসামীদের নাম উল্লেখ করে এই হত্যাকান্ডের বিষয়ে পরিকল্পনা এবং অন্যান্য আসামীদের কার কি ভূমিকা ছিল তা বিস্তারিত বর্ণনা করে আদালতে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেয়।

আরো জানতে……

কালীগঞ্জে বিলের পানিতে ডুবে এগ্রো ফার্মের কর্মীর মৃত্যু