গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী অভিবাসীদের উৎস দেশগুলো তাদের ফিরে যাওয়ার জন্য কতটুকু নিরাপদ, তা পর্যালোচনার ভিত্তিতে একটি তালিকা করেছে ইতালি সরকার। এ তালিকায় বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশকে প্রত্যাবাসিত অভিবাসীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে এসব দেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসীরা এখন থেকে ইতালিতে রাজনৈতিক বা কোনো ধরনের আশ্রয় পাবেন না বলে ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও এ তালিকায় ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, মিসর, পেরু ও শ্রীলংকার মতো দেশের নাম রয়েছে। এসব দেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুরসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী ইতালিতে প্রবেশ করছেন। বিশেষ করে প্রচুর বাংলাদেশী অভিবাসনপ্রত্যাশী এখন উত্তর আফ্রিকা উপকূল থেকে নৌপথে ইউরোপের দেশটির উদ্দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ভূমধ্যসাগরের বিপৎসংকুল নৌপথ পাড়ি দিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারাও যাচ্ছেন অনেকে। উদ্ধারও হচ্ছেন অনেকে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাসহ (আইওএম) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ইতালি সরকারের করা তালিকাগুলোয় অবৈধ অভিবাসীর উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সামনের সারিতে।
নতুন এ তালিকা ইতালি থেকে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে সহজ করে তুলবে বলে প্রত্যাশা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। গত সপ্তাহে এক বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, মিসর, পেরু ও শ্রীলংকাকে ‘নিরাপদ উৎস দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশগুলোয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো সহজ হয়ে আসবে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিক গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে আইনে রূপ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি খুব শিগগির ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। অবৈধভাবে ইতালিতে পৌঁছানো বা পথে দুর্ঘটনার শিকার নৌযানগুলোর উদ্ধারকৃত যাত্রীদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশীরাই ছিল সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে বিপৎসংকুল যাত্রায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে বাংলাদেশী আছে প্রায় ১৩ হাজার।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে ইতালির রোম শহরে বসবাস করছেন বাংলাদেশী অভিবাসী ও গণমাধ্যমকর্মী জমির হোসেন। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ইতালিতে অবৈধভাবে কোনো দেশের নাগরিক যাতে প্রবেশ না করে, সেজন্য দেশটির সরকার ৪ লাখ ৫২ হাজার অভিবাসী কর্মী নিচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হয়ে আগামী বছর পর্যন্ত কর্মী নেয়ার এ প্রক্রিয়া চালু থাকবে। যারা দেশটিতে সিজনাল কাজের পাশাপাশি বাসাবাড়ি, ভারী যানবাহনের চালক ও এমনকি বিভিন্ন মানের হোটেলসহ নানা খাতে কাজ করবেন। যেখানে বাংলাদেশীদেরও কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া বাংলাদেশীদের সেখান থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই চলমান। ইতালি সরকার এটি নিয়ে কয়েক বছর ধরে কাজ করছে।’
ইতালিতে থাকা অভিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর দেশটির সরকার বিভিন্ন কাজের জন্য সিজনাল ভিসা দিয়ে থাকে। এ কাজের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও কর্মী যান। নিয়ম অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট সময় কাজ শেষে এসব নাগরিক নিজ দেশে ফিরে যাবেন। আবার পরের বছর সিজনাল ভিসায় দেশটিতে প্রবেশ করবেন। এভাবে পরপর তিন বছর যাতায়াত থাকলে ইতালি সরকার এসব অভিবাসীকে বৈধ নাগরিকত্বের জন্য কাগজপত্র দেয়ার সুযোগ রাখেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব অভিবাসী দেশটিতে সিজনাল কাজের জন্য আগে গেছেন, তারা আর দেশে ফেরত আসেননি। যে কারণে ইতালি সরকার বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। তবে গত বছর থেকে সেটি উঠে গেছে। যে কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশীরাও বৈধভাবে কাজ নিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করছেন। গত দুই বছর ইতালিতে কর্মী যাওয়া শুরু হয়েছে।
সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে যাওয়া শুরু করে বাংলাদেশীরা। ওই বছর সাড়ে পাঁচশর মতো বাংলাদেশী প্রবেশ করেন দেশটিতে। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অভিবাসীরা দেশটিতে নানা কাজে প্রবেশ করলেও ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশটিতে বৈধভাবে গেছেন হাতে গোনা কয়েকজন। এরপর অবৈধ অভিবাসী প্রশ্নে ইতালি সরকারের কড়াকড়ি আরোপ এবং কভিডসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশীদের বৈধপথে গমন এক প্রকার বন্ধ ছিল।
তবে ২০২২ সালে দেশটিতে পুনরায় যাওয়া শুরু করেছেন বাংলাদেশীদের অনেকে। এ বছর প্রায় আট হাজার অভিবাসী দেশটিতে গেছেন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দেশটিতে ১৬ হাজার ৮৭৯ জন বাংলাদেশী বৈধপথে প্রবেশ করেছেন।
অভিবাসন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশের জন্য ইতালিকে অনেকেই ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। লিবিয়া, তিউনিসিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে দেশটিতে গেছেন অনেকেই। তবে সবার গন্তব্য যে ইতালি এমনটি নয়, অনেকে পর্তুগাল, জার্মানি, গ্রিস ও ডেনমার্কের মতো দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন।