যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, মার্কিন বাহিনীর ইরানি জাহাজ আটকের পর উত্তেজনা বৃদ্ধি

যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, মার্কিন বাহিনীর ইরানি জাহাজ আটকের পর উত্তেজনা বৃদ্ধি

রয়টার্স 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ঘনীভূত হচ্ছে। সোমবার মার্কিন নৌবাহিনী একটি ইরানি পণ্যবাহী জাহাজ আটক করার পর তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। পাশাপাশি ইরান দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে গভীর অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববার ইরানের বন্দর আব্বাস বন্দরের দিকে যাওয়ার সময় একটি ইরানি পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ অবরোধ ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মার্কিন বাহিনী গুলি চালায় এবং জাহাজটি আটক করে। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘তাদের জাহাজ আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ভেতরে কী আছে তা দেখা হচ্ছে!’

ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এক সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সশস্ত্র জলদস্যুতার বিরুদ্ধে শিগগির পাল্টা জবাব দেবে।’

জাহাজ আটকের ঘটনার পর বৈশ্বিক তেলের দাম লাফিয়ে উঠেছে এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। 

বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়ে থাকে। ইরান এই প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে, তুলে নেয় এবং আবার আরোপ করেছে। এই যুদ্ধ এরই মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান নতুন শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। চলমান অবরোধ, হুমকিমূলক বক্তব্য এবং ওয়াশিংটনের ক্রমবর্তমান অবস্থান ও ‘অতিরিক্ত দাবিদাওয়া’কে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদরেজা আরেফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত রেখে অন্যদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ আশা করা যায় না। পছন্দটা স্পষ্ট — হয় সবার জন্য মুক্ত তেলবাজার, নয়তো সবার জন্য ভারী মূল্য চোকানোর ঝুঁকি।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান তাঁর শর্ত প্রত্যাখ্যান করলে মার্কিন বাহিনী সে দেশের প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেবে। পাল্টা হুমকিতে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালালে উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রে আঘাত হানা হবে।

মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন আগে সোমবার সন্ধ্যায় মার্কিন দূতদের ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। 

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স। এক সপ্তাহ আগে প্রথম দফা আলোচনায়ও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দলে আরও থাকবেন ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জারেড কুশনার। তবে ট্রাম্প পরে এবিসি নিউজ ও এমএস নাউকে জানিয়েছেন, ভ্যান্স যাচ্ছেন না।

মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দুটি মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান রোববার বিকেলে একটি বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করেছে, যেগুলোতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও যানবাহন রয়েছে বলে দুই পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ শহরে গণপরিবহন ও ভারী যানচলাচল বন্ধ রেখেছে। গত সপ্তাহের আলোচনাস্থল সেরেনা হোটেলের কাছে কাঁটাতারের বেড়া টানানো হয়েছে এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ অতিথিদের কক্ষ ছেড়ে দিতে বলেছে।

ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আট সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানে এবং একই সময়ে পরিচালিত ইসরায়েলি স্থলঅভিযানে লেবাননে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলে এবং আশপাশের আরব দেশগুলোতে, যেখানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে।

আলোচনায় ইরানের পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ আগে বলেছিলেন, দুই পক্ষ কিছুটা অগ্রগতি করলেও পারমাণবিক প্রশ্ন ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।

ইউরোপীয় মিত্ররা, যাঁরা যুদ্ধে সহায়তা না করায় ট্রাম্পের বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন, আশঙ্কা করছেন যে ওয়াশিংটনের আলোচকেরা এমন একটি দ্রুত ও অগভীর চুক্তির দিকে এগোচ্ছেন, যা বাস্তবায়নে কারিগরিভাবে জটিল দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার প্রয়োজন হবে।