ট্রাম্পের ইরান হামলায় কংগ্রেসে তীব্র সমালোচনা, উঠছে অভিশংসনের দাবি

ট্রাম্পের ইরান হামলায় কংগ্রেসে তীব্র সমালোচনা, উঠছে অভিশংসনের দাবি

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়েই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট এবং কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। কেউ কেউ এটিকে সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে অভিশংসনের দাবিও তুলেছেন।

কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া হামলা: সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ

ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান শন ক্যাস্টেন বলেন, “কোনো রাষ্ট্র যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাৎক্ষণিক হুমকি না হয়ে থাকে, তাহলে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া প্রেসিডেন্টের পক্ষে সেই দেশে হামলা চালানো সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।” তিনি এ ঘটনাকে “স্পষ্টভাবে অভিশংসনযোগ্য অপরাধ” বলে মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, “আমি ইরানে হামলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে খোলা মন রাখি, তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে কংগ্রেসের যুদ্ধঘোষণার ক্ষমতা হরণ করবে, তা মেনে নেওয়া যায় না।”

স্পিকারের পক্ষে সাফাই, ট্রাম্পের ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ ব্যাখ্যা

হাউস স্পিকার মাইক জনসন, একজন রিপাবলিকান, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাস পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যায় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের ক্ষমতার প্রতি সম্মান রেখে, সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক এই হামলা পরিচালনা করেছেন।”

ওকাসিও-কর্টেজ: ‘গুরুতর সংবিধান লঙ্ঘন’

নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ একে “গুরুতর সংবিধান লঙ্ঘন ও কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা উপেক্ষা” হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “এটি এমন এক পদক্ষেপ যা বহু প্রজন্ম ধরে আমাদের যুদ্ধের জালে ফেলে দিতে পারে। এটি অভিশংসনের উপযুক্ত ভিত্তি।”

হাকিম জেফরিস: ‘পূর্ণ দায় প্রেসিডেন্টের’

হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফরিস বলেন, “এই একতরফা সামরিক পদক্ষেপের পরিণতির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পূর্ণভাবে দায়ী।” তিনি বলেন, “তিনি কংগ্রেসকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং কোনো অনুমতি ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে কংগ্রেসকে বিস্তারিতভাবে গোপনে অবহিত করা।”

গোপনে হামলার সিদ্ধান্ত, ক্ষুব্ধ গোয়েন্দা কমিটির সদস্যরা

ডেমোক্র্যাট গোয়েন্দা কমিটির সদস্য জিম হাইমস ও সেন. মার্ক ওয়ার্নার অভিযোগ করেন, হামলার আগে তাদের জানানো হয়নি, বরং রিপাবলিকান সদস্যদের আগাম জানানো হয়েছে।

হাইমস বলেন, “বোমা পড়ার আগেই বিষয়টি জানানো উচিত ছিল। এটা সংবিধানের প্রতি অসম্মান।”

সেন. ওয়ার্নার বলেন, “এটা কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়াই, কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে এবং গোয়েন্দা তথ্যকে অবহেলা করে গৃহীত সিদ্ধান্ত।”

পাল্টা যুক্তি ট্রাম্পের: পারমাণবিক হুমকি

ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। “আমরা সেটা হতে দিতে পারি না,” বলেন তিনি।

সন্দেহ প্রকাশ সেন. টিম কেইনের

ডেমোক্র্যাট সেনেটর টিম কেইন ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে বলেন, “ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কর্মসূচি ২-৩ বছর পিছিয়ে গেছে। তাহলে ট্রাম্প হঠাৎ আজ কেন হামলা চালালেন?”

তিনি যুদ্ধক্ষমতা আইনের অধীনে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, যা কংগ্রেস ছাড়া প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনা সীমিত করবে।

দল-মত নির্বিশেষে সমালোচনা

রিপাবলিকান রিপ. থমাস ম্যাসি বলেন, “ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত হলেও, এটি সংবিধান অনুযায়ী বিচারযোগ্য নয়।” ডেমোক্র্যাট রো খান্না কংগ্রেসকে জরুরি অধিবেশনে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

রিপ. ওয়ারেন ডেভিডসন বলেন, “সিদ্ধান্তটি হয়তো ন্যায়সঙ্গত, তবে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।”

প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতি কমিটির অবস্থান

সেনেট আর্মড সার্ভিসেস চেয়ারম্যান রিপাবলিকান রজার উইকার বলেন, “এখন আমাদের গুরুতর সিদ্ধান্ত নিতে হবে—নাগরিক ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।”
সেনেট ফরেন রিলেশন্স চেয়ারম্যান জিম রিশ বলেন, “এই হামলা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়াবে না। এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও সফল হামলা।”

জনমত ও রাজনৈতিক বিভাজন

জর্জিয়ার রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জোরি টেইলর গ্রিন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সীমান্ত খোলা ছিল, লক্ষাধিক অবৈধ অনুপ্রবেশ হয়েছে। এখন যেন কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা না হয়, সেই দোয়া করি।”

টালসায় এক সমাবেশে সেন. বার্নি স্যান্ডার্স হামলার খবর জানিয়ে বলেন, “আর যুদ্ধ নয়। এটি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। কেবল কংগ্রেসেরই যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার আছে।”

ইরাক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা

ডেমোক্র্যাট রিপ. লয়েড ডগেট বলেন, “এই হামলা পারমাণবিক কার্যক্রম থামাতে পারে, তবে তা ইরানিদের ক্ষুব্ধ করে তুলবে এবং আরও কঠোর প্রতিশোধে উসকানি দেবে।”

তিনি সতর্ক করেন, “ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন পতনের পর ৪,০০০ মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারান, ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ইরানেও তেমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা অমূলক নয়।”

ট্রাম্প প্রশাসনের এই একতরফা সিদ্ধান্ত মার্কিন কংগ্রেস ও রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। অভিশংসনের আওয়াজ ও যুদ্ধক্ষমতা আইন কার্যকর করার দাবিতে আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসে উত্তপ্ত পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উভয়পক্ষই যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা কামনা করেছেন। এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ কী হয়।

অভিশংসন কী?

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বলা আছে, বেশ কিছু অপরাধের জন্যে প্রেসিডেন্টকেও তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া অর্থাৎ তাকে ইমপিচ করা যেতে পারে। ইতিহাসে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের ঘটনা বিরল। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।

অভিশংসনের প্রক্রিয়া কী?

অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস থেকে। এটি মার্কিন কংগ্রেসের একটি অংশ। এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্যে এটি সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে হবে।আর সেটা পাস হলে পরের ধাপে বিচার অনুষ্ঠিত হবে সেনেটে, যেটা কংগ্রেসের দ্বিতীয় অংশ। এটা অনেকটা আদালত কক্ষের মতো, যেখানে সিনেটররা বিচারক বা জুরি হিসেবে কাজ করবেন। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট দোষী কি নির্দোষ। ফলে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে হলে এই সেনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরকে ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট দিতে হবে।

ইতিহাস

২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের আগে সর্বশেষ যে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তিনি বিল ক্লিনটন। ১৯৯৮ সালে ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্যে ভোট পড়েছিল প্রতিনিধি পরিষদে। এর আগে এরকম ঘটনা ঘটেছিল ১৮৬৮ সালে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসনের বিরুদ্ধেও অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ক্লিনটন কিংবা জনসন তাদের কাউকেই সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।

অর্থাৎ অভিশংসন মানেই এটা নয় যে এর প্রক্রিয়া শুরু হলেই প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত কোন প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের কারণে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে একজন প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। তিনি রিচার্ড নিক্সন। ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালে জর্জরিত হয়ে ১৯৭৪ সালে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, প্রক্রিয়াটি শুরু হলে তাকে হয়তো প্রেসিডেন্টের পদ থেকে শেষ পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হতো।