গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের কথা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ওই হামলা চালান। নাম ছিল ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’। ইতিহাসে এটি ‘ইরাক যুদ্ধ’ নামেও পরিচিত।
ইরাকে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন বিশ্বের নানা প্রান্তে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তবে সমালোচনা হলেও জর্জ বুশ তার ইরাক আগ্রাসনের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাক আগ্রাসনকে ‘একটি ধর্মযুদ্ধ’ বা ক্রুসেড হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ঈশ্বর কর্তৃক নির্বাচিত জাতি। আর বিশ্বের ‘দুষ্টদের’ দমন করাই তার কাজ।
সদ্য প্রকাশিত নথি থেকে এসব তথ্য জানিয়েছে টেলিগ্রাফ। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আর্কাইভস ওই সব তথ্য প্রকাশ করেছে মঙ্গলবার।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত বলেছেন যে, যুদ্ধের মাত্র কয়েক মাস আগে জর্জ বুশ বিশ্বাস করতেন যে, ইরাকি স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা তার ‘মিশন’ বা দায়িত্ব। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী ছিল যুক্তরাজ্য। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি জাতিসংঘের অনুমোদনের পক্ষে ছিলেন।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত মন্ত্রিপরিষদ অফিসের কাগজপত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়া যুদ্ধে জড়ালে স্যার টনি ব্লেয়ারকে তার ‘দপ্তর থেকে জোরপূর্বক অপসারণ’ করা হতে পারে বলে মনে করতেন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা।
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ফাইলগুলো ২০০২ সালের ডিসেম্বরের। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত তৎকালীন রাষ্ট্রদূত স্যার ক্রিস্টোফার মেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘বার্ষিক পর্যালোচনা’সহ মন্ত্রিপরিষদ অফিসে নোট পাঠান। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জর্জ ডব্লিউ বুশ সাদ্দামকে উৎখাত করতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, বিশ্বকে দুষ্ট লোক থেকে মুক্ত করা তার কাজ।
স্যার ক্রিস্টোফার মেয়ার তার সরকারের কাছে একটি কূটনৈতিক তারবার্তা পাঠান তখন। তাতে তিনি লিখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওই সময় মনে হয়েছিল তার দেশ আরেকটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে সেই হামলার সঙ্গে ইরাকি সংযোগ থাকতে পারে।’
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখনকার বিশ্ব সম্পর্ক ‘ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি’ পোষণ করতেন। দুষ্টদের নির্মূল করাকে তিনি তার লক্ষ্য বলে মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, আমেরিকান মূল্যবোধ সর্বজনীন হওয়া উচিত। তিনি ওসামা বিন লাদেন এবং সাদ্দাম হোসেনের মধ্যে ইউরোপীয়দের মতপার্থক্যকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে মনে করতেন। সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয়দের প্রতি জর্জ ডব্লিউ বুশের এক ধরনের অ্যালার্জি ছিল।
পরের মাস ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে স্যার টনি ব্লেয়ার উড়ে যান ক্যাম্প ডেভিডে। তার লক্ষ্য ছিল সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে কূটনীতির পথে অগ্রসর হতে অনুরোধ করা। কিন্তু বৈঠকের মাত্র দুই দিন আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার টনি ব্লেয়ারকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, সাদ্দাম হোসেন আত্মসমর্পণ না করলে যুদ্ধ থেকে সরে আসা তার জন্য রাজনৈতিকভাবে ‘অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা অবশ্য তখনো আশা করছিলেন যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরাকের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য একটি নতুন প্রস্তাবে অনমোদন দিতে সম্মত হবে।
তবে, জাতিসংঘের পরিদর্শকরা সাদ্দাম হোসেনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র, যুদ্ধের অনুমিত যৌক্তিকতা সম্পর্কে কোনো প্রমাণ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত ফ্রান্স এবং রাশিয়া জাতিসংঘের প্রস্তাবে সম্মত হতে অনীহা প্রকাশ করে। এতে করে আমেরিকানরা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।
টনি ব্লেয়ারের সফরের কিছুক্ষণ আগে কংগ্রেসে জর্জ বুশের বার্ষিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের পর স্যার ক্রিস্টোফার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিকল্পগুলো কার্যকরভাবে শেষ হয়ে গেছে।
২৯ জানুয়ারি তিনি ব্রিটিশ সরকারকে লিখেন, ‘সাদ্দাম হোসেনের আত্মসমর্পণ বা দৃশ্যপট থেকে নিখোঁজ না হওয়া পর্যন্ত বুশের পক্ষে এই বসন্তে ইরাকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে পিছু হটা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব।’
ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে কি না, তা আবিষ্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক হ্যান্স ব্লিক্সের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্লিক্সকে পরিস্থিতি সামালের সুযোগ দেওয়ার ধৈর্য জর্জ বুশের নেই।’
এর এক দিন পর ২০০৩ সালের ৩০ জানুয়ারি স্যার টনি ব্লেয়ারের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা স্যার ডেভিড ম্যানিং বলেন, ‘পরের দিন ক্যাম্প ডেভিডে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার সময় তার উচিত এই বিষয়টি তুলে ধরা যে, একটি নতুন প্রস্তাব যুক্তরাজ্যের জন্য রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই আইনগতভাবেও অপরিহার্য।’
স্যার ডেভিড ম্যানিং তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কন্ডোলিজা রাইসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। বলেন, সাদ্দামকে মোকাবিলা করার প্রতিশ্রুতি টনি ব্লেয়ারের আগের মতোই দৃঢ় রয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা রাইসকে বলেন, ‘‘টনি ব্লেয়ার যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাজি ধরতে পারবেন না। কারণ জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস ছাড়া ইরাক আক্রমণ করার চেষ্টা করলে তাকে ‘পদ থেকে জোর করে বরখাস্ত’ করা হতে পারে।’’
তিনি বলেন, ‘লন্ডনে শাসন পরিবর্তনের মূল্যে বাগদাদে শাসন পরিবর্তনকে উৎসাহিত করা আমেরিকার উচিত নয়।’
স্যার ডেভিড ম্যানিং বলেন, ‘আমি টনি ব্লেয়ারকে বলেছিলাম যে, বুশ জুয়া খেলার সামর্থ্য রাখতে পারেন। জর্জ বুশ জাতিসংঘে হামলার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। একতরফাভাবে হামলা করার জন্য কংগ্রেসে কর্তৃত্ব ছিল তার। আপনি (টনি ব্লেয়ার) যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন তার থেকে এটি বেশ আলাদা ছিল। কন্ডোলিজা রাইস এটি স্বীকার করেন। কিন্তু বলেন, ‘পোকার খেলায় এমন একটি সময় আসে, যখন আপনাকে আপনার কার্ড দেখাতে হয়। আমি বলেছিলাম যে, এটি বুশের জন্য ঠিক আছে। তিনি যদি তার কার্ড দেখান এবং হেরে যান তবেও তিনি টেবিলে থাকবেন। আপনি তা করবেন না।’
এ হামলার ব্যাপারে ফ্রান্সের ও মতামতের প্রয়োজন ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা পরিষদের একটি নতুন প্রস্তাবে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা ত্যাগ করায় ফরাসি রাষ্ট্রপতি জ্যাক শিরাক হামলায় সায় দিতে অস্বীকৃতি জানান।