ভ্যাটিকানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মার্কিন নাগরিক পোপ হয়েছেন। কিন্তু পোপ লিও চতুর্দশ এখন সেই দেশেরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে সোচ্চার আন্তর্জাতিক সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আফ্রিকা সফরকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের এই দ্বন্দ্ব এখন বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে।
আফ্রিকা সফরের প্রথম দিন আলজেরিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় পোপ লিও পেপাল বিমানে সাংবাদিকদের সামনে এক অসাধারণ মন্তব্য করেন।
রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের তীব্র আক্রমণের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না যে গসপেলের বাণীকে কেউ কেউ যেভাবে ব্যবহার করছেন, সেভাবে ব্যবহার করা উচিত। অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে… আমি বিশ্বাস করি, কাউকে না কাউকে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে হবে যে এর চেয়ে ভালো পথ আছে।’
ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি মোকাবেলা করার এই সিদ্ধান্ত পোপদের সাধারণ রীতির বাইরে। সাধারণত পোপরা কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে নাম ধরে সমালোচনা করেন না। কিন্তু ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে লিও সেই সীমা অতিক্রম করেছেন।
শিকাগোয় জন্মগ্রহণকারী পোপ লিও অগাস্টিনীয় ধর্মসংঘের সদস্য হিসেবে দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন, যেখানে দারিদ্র্য, পবিত্রতা ও আনুগত্যের শপথ নেওয়া হয়। লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই পোপ তাঁর মৃদু ও শান্তশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত। তবে ইরান সংকট তাঁর ভেতরের দৃঢ়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
দ্বাদশ শতাব্দীর পর প্রথমবারের মতো কোনো পোপের মাতৃভাষা ইংরেজি। এই কারণে তাঁর বক্তব্য সরাসরি মার্কিন জনমানসে, হোয়াইট হাউসে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব ফেলছে। ভ্যাটিকান সূত্র জানায়, পোপ লিও তাঁর ‘পোকার ফেস’ বা অভেদ্য মুখভঙ্গির জন্যও পরিচিত, যা তাঁর কথার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

আফ্রিকা সফরে ক্যামেরুনের বামেন্দায় এক শান্তি সমাবেশে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীকে কিছু স্বৈরশাসক ধ্বংস করছে, অথচ এটাকে ধরে রেখেছে কোটি কোটি মানুষের সৌভ্রাতৃত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা ধর্মকে এবং ঈশ্বরের নামকে নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, তাদের জন্য সর্বনাশ অপেক্ষা করছে।’
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে আসছিলেন। পোপের এই বক্তব্য সেই অবস্থানের সরাসরি পাল্টা বার্তা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই বিতর্কে এবার যোগ দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, যিনি ২০১৯ সালে ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। তিনি বলেন, পোপের উচিত ‘জাস্ট ওয়ার’ বা ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব স্মরণ রেখে কথা বলা।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হলেন সন্ত অগাস্টিন অব হিপ্পো — ঠিক যে সংঘের পোপ লিও নিজে সদস্য। আলজেরিয়ায় থাকাকালীন পোপ সেই স্থানে ব্যক্তিগত তীর্থযাত্রাও করেন, যেখানে চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে অগাস্টিন বিশপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ভ্যাটিকান নিউজের সম্পাদকীয় পরিচালক আন্দ্রেয়া তর্নিয়েল্লি বলেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ক্যাথলিক শিক্ষা দেখিয়েছে যে ‘ন্যায়যুদ্ধের’ দাবি করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে, বিশেষত পরমাণু যুগে। পোপ লিও তাঁর পূর্বসূরিদের পথ ধরেই শান্তি, সংলাপ ও আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন।
উল্লেখযোগ্য যে, গত বছর কনক্লেভের আগে ট্রাম্প নিজেকে পোপের বেশে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্মিত ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। আর পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে লিওর সঙ্গে কোনো সরাসরি যোগাযোগ করেননি।
পোপের অভিষেকে ট্রাম্পের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, যিনি তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ভ্যাটিকান জানিয়েছে, ২০২৬ সালে পোপ যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন না। বরং মার্কিন স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীতে, অর্থাৎ আগামী ৪ জুলাই, তিনি থাকবেন ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপে — যা অভিবাসীদের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকলে পোপের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবারের মেয়াদে সম্ভব নয়।
ক্যাথলিক মিডিয়া আউটলেট আমেরিকার ভ্যাটিকান সংবাদদাতা জেরার্ড ও’কনেল বলেন, ‘আমার মনে পড়ছে হ্যারল্ড ম্যাকমিলানের কথা, যিনি বলেছিলেন ভ্যাটিকানকে আক্রমণ করা বিজ্ঞের কাজ নয়। ভ্যাটিকান এটিকে ইতিহাসের আলোকেই দেখবে — সাম্রাজ্য আসে, সাম্রাজ্য যায়।’
উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে শীতল যুদ্ধের উচ্চতায় প্রথম পোলিশ পোপ জন পল দ্বিতীয় নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতনে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক হিসেবে স্বীকৃত। অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে পোপ লিওর ভূমিকাও ভবিষ্যতে অনুরূপ ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেতে পারে।