সীমানা পুনর্নিধারণ নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে নির্বাচন কমিশন

সীমানা পুনর্নিধারণ নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে নির্বাচন কমিশন

ডয়চে ভেলে : জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে বিক্ষোভ আন্দোলন। আন্দোলনরতদের দাবি পুরণ আইনগতভাবে কতটা সম্ভব?

অনেক এলাকায় স্থানীয়ভাবে সব দলই অংশ নিচ্ছে আন্দোলনে। এসব আন্দোলন কীভাবে সামাল দেয়া হবে?

তবে নির্বাচন কমিশনের সচিব ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন দাবি পূরণের বিষয়টি বিবেচনাতেই নেই তাদের৷ তিনি বলেন, ” কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা চূড়ান্ত। এটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ কমিশনের দিক থেকে নাই।” তবে নির্বাচন-ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে,” কী সমস্যা হয়েছে তা পর্যালোচনা করে দেখা যায়।”

নির্বাচন কমিশন এবার যে সংসদীয় আসনের সীমানাপুনর্নির্ধারণ করার পর ৩০০ আসনের ২৬১ আসনের সীমানা আগের মতো থাকলেও ৩৯টি আসনের সীমানা বদলে গেছে। এর ফলে বাগেরহাট জেলায় চারটি আসন থেকে একটি কমে হয়েছে তিনটি। গাজীপুর জেলায় একটি আসন বেড়েছে। সেখানে আগে ছিল পাঁচটি, এখন হয়েছে ছয়টি।। অন্য ৩৭টি আসনের মধ্যে কোনো আসনের সীমানা বেড়েছে আবার কোনোটিরর সীমানা কমেছে। ফলে কোনো আসন থেকে দুই-একটি ইউনিয়ন বাদ পড়েছে। সেগুলো আবার অন্য আসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সীমানা পুনর্নিধারণের কমপক্ষে তিনটি নীতিমালা আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, জনসংখ্যা। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যাকে ৩০০ আসন দিয়ে ভাগ করলে যে ফল আসে তা থেকে একটি সংসদীয় এলাকার জনসংখ্যার একটি মান ঠিক করা হয়। কারণ, আসন সংখ্যা ৩০০ থাকবে। এবার প্রতিটি আসনের গড় জনসংখ্যা ধরা হয়েছে চার লাখ ২০ হাজার ৫০০। ফলে ভৌগোলিক সীমার চেয়ে জনসংখ্যার সাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় সীমানা নির্ধারণে, জানান বিশ্লেষকরা। এবার পার্বত্য তিন জেলার আসন সীমানায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এই সীমানা পুনর্নিধারণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। হরতাল হচ্ছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা ও থানায় হামলা এবং সড়ক ও রেললাইন অবরোধের মতো ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলন হচ্ছে বাগেরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পাবনাসহ আরো কিছু এলাকায়। এই ইস্যু নিয়ে উচ্চ আদালতে রিটও করা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সীমানা পুননির্ধারণের বিষয়ে সাংবিধানিকভাবে কানো আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুয্গে নেই বলে জানান আইন বিশ্লেষকরা।

তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত৷ কারণ, যেসব এলাকার লোকজন নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত মনে করছেন, ওই এলাকার সব রাজনৈতিক দলই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে।

ফরিদপুর-৪ (চরভদ্রাসন-সদরপুর-ভাঙা) আসনের অন্তর্গত দুইটি ইউনিয়ন আলগী ও হামিরদী জাতীয় সংসদীয় আসন ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা)-র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ওই দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারা আগের সংসদীয় এলাকায়ই থাকতে চাচ্ছেন। ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদারেস আলী ইসা ডয়চে ভেলেকে বলেন, “যে দুইটি ইউনিয়ন বিচ্ছিন্ন করে ফরিদপুর-২ আসনে যুক্ত করা হয়েছে, তারা ওই আসনে যুক্ত হতে রাজি নন। কারণ, তাদের দূরত্ব প্রশাসনিক এলাকা থেকে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে। তারা তাদের কাজের জন্য এত দূরে যেতে চান না। আর তারা সংসদীয় আসনে তাদের উপজেলা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এই কারণেই আন্দোলন। সব রাজনৈতিক দলই এই আন্দোলনে আছে। তবে আমরা আন্দোলন আগামী ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করেছি সর্বশেষ কী হয় তা দেখার জন্য।”

এরই মধ্যে এই ঘটনায় হাইকোর্টে রিটও করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে আগের সীমানা বহাল রাখার অনুরোধ করেছেন। তবে পুলিশ দাবি করেছে, চলমান আন্দোলনের সঙ্গে ফ্যাসিবাদের লোকজন যুক্ত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তী ও চান্দুরা ইউনিয়ন দুটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসন থেকে কেটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এটা মানতে রাজী নন বিজয়নগর উপজেলার বাসিন্দারা। তারাও আগের সীমানা বহাল চাইছেন। তারাও আন্দোলন, সড়ক অবরোধ করছেন।

বিজয়নগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইমাম হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “বিজয়নগরের যে দুই ইউনিয়ন কেটে সরাইলের সঙ্গে দেয়া হয়েছে, ওই দুই ইউনিয়নের দূরত্ব সরাইল থেকে ৩০ কিলোমিটার। বিজয়নগর তাদের কাছে। তারা তো এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ” ওই এলাকার বাসিন্দাদের পক্ষেও হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। ইমাম হোসেন জানান, তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনাসহ ৩৮টি সংসদীয় এলাকায়। আগের সীমানা পরিবর্তন হয়ে গেছে। পাবনা-১ আসনে জায়গা পেয়েছে সাঁথিয়া উপজেলা, বেড়া উপজেলার-বেড়া পৌরসভা, হাটুরিয়া নাকালিয়া, নতুন ভারেংগা, চাকলা ও কৈটোলা ইউপি। সুজানগর উপজেলা এবং বেড়া পৌরসভা, হাটুরিয়া নাকালিয়া, নতুন ভারেংগা, চাকলা ও কৈটোলা ইউপি ছাড়া বেড়া উপজেলার বাকি অংশ নিয়ে পাবনা-২ আসন করেছে ইসি। সেখানেও আন্দোলন হচ্ছে। হাইকোর্টে রিট হয়েছে।

তবে বাগেরহাট জেলার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ওই জেলায় একটি আসনই কমে গেছে। সেখানেও সড়ক অবরোধসহ নানা ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে। রিট করা হয়েছে হাইকোর্টে। বাগেরহাটের বাসিন্দা ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ওই রিট আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, “বাগেরহাটের একটি আসন কমেছে আর গাজীপুরে একটি বেড়েছে। আমাদের একটি আসন কমে যাওয়ায় পুরো জেলার সংসদীয় সব আসনের সীমানাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার নিজের আসন এখন আর নাই। একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে পুরো জেলার মানুষ ক্ষুব্ধ। তারা হরতালও করেছে। আদালত রুল দিয়েছেন।”

তার কথা, “বাগেরহাট দেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম জেলা। এই জেলায় সীমানা পুননির্ধারণ করতে গিয়ে সংবিধান এবং আইন কোনোটাই মানা হয়নি।”

আইন অনুযায়ী দেশে প্রত্যেক আদমশুমারীর পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করা হয়, যাতে জনসংখ্যা ও ভোটের সাম্য থাকে। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারন করা হয়েছিল। এরপর আবার এবার করা হলো। বাংলাদেশে সর্বশেষ জনগণনা হয় ২০২২ সালে । তখন দেশের জনসংখ্যা হিসাব করা হয় ১৬ কোটি ৫১ লাখ ১১ হাজার। আর বাংলাদেশে এখন ভোটার ১২ কোটি ৬১ লাখ।

নির্বাচন কমিশন সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে প্রথমে খসড়া প্রকাশ করে। এরপর যত অভিযোগ পড়ে, তার ওপর শুনানি হয়। শুনানি নিস্পত্তি করে এই নতুন সংসদীয় আসনের তালিকা গেজেট আকারেও প্রকাশ করা হয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ” প্রতি পাঁচ বছর পর পর সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নিধারণ করতে হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। তবে আদমশুমারী না হলে তো করা যায় না। এবার সর্বশেষ আদমশুমারী ও ভোটারের ভিত্তিতে করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো, প্রতিটি আসনের সঙ্গে যেন জনসংখ্যার সংখ্যা সাম্য থাকে। আর সেটা যেন প্লাস, মাইনাস পাঁচ শতাশের কম বা বেশি না হয়। এর সঙ্গে ভৌগোলিক সীমানা ও প্রশাসনিক ইউনিট যাতে না ভাঙে, তা-ও দেখতে হবে। এথনিক বাউন্ডারি যাতে না ভাঙে তা-ও দেখতে হবে।”

তার কথা, “এবার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব, সংস্কার সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন কাজটি করেছে। কিন্তু যেহেতু তার ভিত্তিতে নতুন আইন এখনো হয়নি, তাই তারা পুরনো আইনের ভিত্তিতে নতুন সংস্কার প্রস্তাবগুলো মাথায় রেখে করেছে। তারপরও পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত হয়েছে তা আমি বলবো না। হয়তো সময় স্বল্পতার কারণে তারা পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত করতে পারেনি। জনসংখ্যার সাম্য আনতে বাগেরহাটে একটি আসন কমেছে, গাজীপুরে একটি কমেছে। তবে যে বিভিন্ন ইউনিয়ন কেটে অন্য আসনে নেয়া হয়েছে, এতে উপজেলার প্রশাসনিক ভাগ হয়েছে। হয়তো এগুলো এড়ানো যেতো।”

তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত তো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কমিশনকে সেই ক্ষমতা দেয়া আছে। তবে এই সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে যে মানুষকে বোঝানো, তাদের সঙ্গে তথ্য বিনিয়ময়- এগুলো করা হলে এই ক্ষোভ তৈরি হতো না। এটা তো ঠিক যে, এক লাখ লোক দিয়ে একটি সংসদীয় আসনম আবার তিন লাখ লোক দিয়ে আরেকটি সংসদীয় আসন করা যায় না। এটা অসাম্য।”

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের আরেক সদস্য ড. জাহেদ উর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আসলে এবার সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণ করা আসলেই নির্বাচন কমিশনকে চ্যালঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ, গত ১৬-১৭ বছর ধরে তো এটা করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন আসনের লোকজন, প্রার্থী ওই সীমানায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সেভাবেই ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। নতুন সীমানা হওয়ায় কোনো প্রার্থী ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আবার কোনো প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। আর বাগেরহাটে একটি আসন কমে যাওয়ায় ওখানে যারা এমপি হওয়ার আশায় ছিলেন, তারা তো বড় ক্ষতির মুখে পড়লেন। সমস্যাটা সেখানে।”

তবে এই নতুন করে সীমান নির্ধারণে কেউ কেউ আবার খুশি৷ দেশের কয়েকটি এলাকায় মিষ্টি বিতরণের ঘটনাও ঘটেছে। যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিজয়নগরে ক্ষোভ দেখা দিলেও পাশের আরেকটি আসনের প্রার্থী মিষ্টি বিরতরণ করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের। আইনে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না বলা হলেও এটা কোনো সমস্যা নয়। যদি আইন ও সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটে, সেটা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে রিট করা যায়। রিটের অধিকার কখনোই বন্ধ হয় না। আর এটা সর্বোচ্চ আদালতের এখতিয়ার।”

“আর জনসংখ্যা বিবেচনা করে বিভিন্ন আসনের মধ্যে সাম্য আনতে সীমানা তো পুনর্নিধারণ করতে হয়। সেটা সব নিয়ম মেনে করলে কোনা সমস্যা হওয়ার কথা নয়,” বলেন তিনি।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে,” কী সমস্যা হয়েছে তা পর্যালোচনা করে দেখা যায়। বিভিন্ন জায়গায় তো সমস্যা হচ্ছে। আন্দোলন হচ্ছে, হরতাল হচ্ছে। বাগেরহাটে তো একটি আসন নাই হয়ে গেছে। আমরা এখন সংস্কার নিয়ে কাজ করছি৷ এটা শেষ হওয়ার পর পর্যালোচনা করে দেখবো।”

নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ” আমরা সংবিধান , আইন, নীতিমালা সব মেনে এই সীমানা পুনর্নিধারণ করেছি। প্রথমে খসড়া করা হয়েছে। তারপর যারা আপত্তি দিয়েছেন তার ওপর কমিশন শুনানি করে চূড়ান্ত নিস্পত্তি করে গেজেট প্রকাশ করেছে। এখন এটাই চূড়ান্ত।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সীমানা নির্ধারণ আইনের ৬(৩)-এ বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আর ধারা ৭-এ বলা হয়েছে, এটা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। তারপরও কয়েকটি রিট হয়েছে। রিট করা মৌলিক অধিকার। আদালত যদি কোনো সিদ্ধান্ত দেয় তা আমরা মেনে নেবো।”