আলোচিতজাতীয়সারাদেশ

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে নিহত ৫

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের কারণে উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতেই প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন শতাধিক।

নিহতদের মধ্যে সানশেড ভেঙে মাথায় পড়ে বাবা-ছেলে, দেয়াল চাপায় এক বৃদ্ধ ও গাছ থেকে পড়ে একজন মারা গেছেন। অপরজন প্রাণ হারিয়েছেন আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।

সদর হাসপাতাল ও পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষসহ নরসিংদীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন সংবাদ মাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের গাবতলি এলাকার দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল (৪০) ও তার ছেলে হাফেজ মো. ওমর (৮), পলাশ উপজেলার মালিতা পশ্চিমপাড়া গ্রামের কাজেম আলী ভূইয়া (৭৫) ও কাজীরচর নয়াপাড়া গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দিনের ছেলে নাসির উদ্দিন (৬৫) এবং শিবপুরের জয়নগর ইউনিয়নের আজকীতলা গ্রামের ফোরকান মিয়া (৪৫)।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদী সদর ও পলাশ উপজেলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এ ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড।

এতে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। নরসিংদীতে সার্কিট হাউজ-পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।

যেভাবে মারা গেলেন চারজন

ভূমিকম্পের সময় সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের গাবতলি এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল থেকে ইট ধসে পাশের বসতবাড়ির ছাদের ওপর আছড়ে পড়ে।

এতে বাড়ির সানশেড ভেঙে দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল. তার ছেলে মো. ওমর ও দুই মেয়ে আহত হয়।

তাদেরকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাবা ও ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

সেখানে নিয়ে গেলে ওমরকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। বাবা দেলোয়ার হোসেনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক।

ওমরের চাচা জাকির হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “ভূমিকম্পের সময় দেলোয়ার তার এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে বাইরে যাচ্ছিলেন। এসময় বাসার সানশেড ভেঙে তাদের উপর পড়ে দুইজন গুরুতর আহত হয়।

“পরে স্থানীয়রা তাদেরকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে বাবা ও ছেলেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসলে চিকিৎসক ওমরকে মৃত ঘোষণা করেন।”

দেলোয়ারের দুই মেয়ে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি আছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ভূমিকম্পের সময় মাটির ঘরের দেয়াল ধসে প্রাণ হানিয়েছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মালিতা পশ্চিমপাড়া গ্রামের কাজেম আলী ভূইয়া (৭৫)।

তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আব্দুল্লাহ আল মামুন।

অপরদিকে শিবপুর মডেল থানার ওসি মো. আফজাল হোসাইন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন শিবপুর উপজেলার ইউনিয়নের আজকীতলা পূর্বপাড়া গ্রামের শরাফত আলীর ছেলে ফোরকান মিয়া (৪৫)।

তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান।

এ ছাড়া ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হন ৬৫ বছরের নাসির উদ্দিন। তিনি কাজীরচর নয়াপাড়া গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দিনের ছেলে।

স্থানীয়দের বরাতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ভূমিকম্পের সময় ফসলী জমি থেকে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে আসার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হন নাসির উদ্দিন। রাস্তা থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিক মৃত্যুবরণ করায় নিকটাত্মীয়রা তার লাশ হাসাপাতালে নেননি।

বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন শতাধিক

ভূমিকম্পে শহর-গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ভবন, বসতবাড়ি, মার্কেট ও দোকানপাট থেকে তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছেন।

এছাড়া ভূমিকম্পের সময় অনেকে মাথা ঘুরপাক খেয়ে বা বুকে ব্যথা নিয়ে পড়ে গিয়েও আহত হয়েছেন।

এসব ঘটনায় আহতদের মধ্যে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ৫৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ১০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

এছাড়া পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অর্ধশত চিকিৎসা নিয়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সিভিল সার্জন সৈয়দ আমীরুল হক শামীম।

ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগুন, সার কারখানা বন্ধ

ভূমিকম্পে ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সাবস্টেশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পুড়ে যায়। যার কারণে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে।

পলাশ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আব্দুল শহীদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, খবর পেয়ে পলাশ ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিটের চেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়।

ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. এনামুল হক সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ভূমিকম্পে এ আগুনের ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে।

এছাড়া ভূ-কম্পণে কারণে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন।

ভূমিকম্পের সময় কারখানার ইঞ্জিন মেশিনারিজ ভাইব্রেশনের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যায়। সেসব মেশিনারিজ এখন চেকিং অপারেশনে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন ভবনে ফাটল, মাটি ফেটে চৌচির

ভূমিকম্পে জেলার বড় কোনো ভবন ধসের ঘটনা না ঘটলেও সার্কিট হাউসহ অনেক ভবন ও বাড়িঘরে ছোট বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। হেলে গেছে একটি ভবন।

এর মধ্যে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চারটি আবাসিক ভবনে কিছুটা ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

ফাটল দেখা দিয়েছে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল বাজারের ছয়তলা বিল্ডিং এসএ প্লাজায়। এ ভবনে থাকা মারকাযুস্ সুন্নাহ তাহ্ফীজুল কুরআন মাদ্রাসার পরিচালক মুফতী সালাহ উদ্দীন আনসারী তা সংবাদ মাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া ঘোড়াশালের লেবুপাড়া এলাকায় ঘোড়াশাল ডেইরী ফার্মের মাঠের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।

এছাড়া পলাশ রেসিডেনসিয়াল স্কুলের পাশে একটি বিল্ডিং এ ফাটল দিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

ঘোড়াশাল নতুন বাজার গ্রামের ইসহাক মিয়ার বাড়ি ভেঙে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এছাড়া প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার খ্যাত পাইকারী কাপড়ের হাট নরসিংদীর শেখেরচর বাবুরহাট বাজারের ধুমকেতু মাঠে একটি চারতলা ভবন সামান্য হেলে গেছে।

শহরের গাবতলী এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আরাফাত শাহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “ভূমিকম্পে আমার চারতলা বিল্ডিং এর বিভিন্ন দেয়ালের টাইলস ভেঙে পড়ে। এতে বিভিন্ন আসবাবপত্র ভেঙে গেছে। তবে বাসার সবাই সুস্থ আছি, কিন্তু আতংকে রয়েছি। বিশেষ করে বাচ্চারা অনেক ভয় পেয়েছে।”

নরসিংদীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। বিভিন্ন টিমের মাধ্যমে সমন্বয় করে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সরকারের নির্দেশনামতে পরবর্তীতে সবধরনের সহায়তা করা হবে।

সূত্র: বিডিনিউজ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button