মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে কারসাজি, আরও ৬০ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে কারসাজি, আরও ৬০ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে কারসাজি করে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় আরও ৬০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকসহ ১২৪ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৬০টি মামলা করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামিরা মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জনের কাছ থেকে সরকার-নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ওই পরিমাণ টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হচ্ছে।

বুধবার (১০ ডিসেম্বর) কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে মামলা দায়েরের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়। দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) যেকোনো সময় দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাগুলো করা হবে।

এর আগে গত কয়েক মাসে একই ধরনের অভিযোগে অন্য ৪০টি এজেন্সির ১০৮ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৪০টি মামলা হয়। এই ৪০ মামলায় ২ লাখ ৫ হাজার ২৮৪ জনের কাছ থেকে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি ৯৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে ৪ লাখ ৭২ হাজার ৫৬০ জনের কাছ থেকে সরকার-নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ৭ হাজার ৯৮৪ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের মামলায় আসামির তালিকায় আছেন ১০০টি এজেন্সির মোট ২৩২ জন ব্যক্তি।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, অনুমোদিত এজাহারে একক মালিকানার এজেন্সির ক্ষেত্রে একজন এবং যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি আসামির তালিকায় এসেছেন। এজাহারে অন্তর্ভুক্ত ৬০টি এজেন্সি হলো সরকার ইন্টারন্যাশনাল, গাজীপুর এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, ঐশী ইন্টারন্যাশনাল, পাথ ফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল, আল বোখারী ইন্টারন্যাশনাল, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ হোল্ডিংস প্রাইভেট লিমিটেড, আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল, দি সুপার ইস্টার্ন লি., ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেট সার্ভিসেস লিমিটেড, স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, পিএন এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি ঢাকা লিমিটেড, দরবার গ্লোবাল ওভারসিস লিমিটেড, আল খামিস ইন্টারন্যাশনাল, দেশারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, এসওএস ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস লিমিটেড, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, হায়দরী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল, ইস্ট ওয়েস্ট প্যারাডাইস, বেসিক পাওয়ার অ্যান্ড কেয়ার ওভারসিজ, বিডি গ্লোবাল বিজনেস, ফিউচার ইন্টারন্যাশনাল, আহাদ ইন্টারন্যাশনাল লি., আগা ইন্টারন্যাশনাল, এলিগ্যান্টস ওভারসিজ লিমিটেড, আল-হেরা ওভারসিজ, এএনজেড মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল, মদিনা ওভারসিজ প্রা. লিমিটেড, নেক্সট ওভারসিজ লি., ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেড, গ্যালাক্সি করপোরেশন, ম্যানেইজ পাওয়ার করপোরেশন লি. এশা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, মুবিন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, জেজি আল ফালাহ ম্যানেজমেন্ট, নিউ হেভেন ইন্টারন্যাশনাল, মনছুর আলী ওভারসিজ অ্যান্ড ট্রাভেলস, ম্যাচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নাতাশা ওভারসিজ, শান ওভারসিজ, অপরাজিতা ওভারসিজ, মোহাম্মদ নুরুজ্জামান অ্যান্ড সন্স, ত্রিবেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, আক্তার রিক্রুটিং এজেন্সি, মৃধা ইন্টারন্যাশনাল, ফোর সাইট ইন্টারন্যাশনাল, সুলতান ওভারসিজ লিমিটেড, রানওয়ে ইন্টারন্যাশনাল, প্রভাতী ইন্টারন্যাশনাল, জনতা ট্রাভেলস, উইন ইন্টারন্যাশনাল, কমফোর্ট ওভারসিজ কনসাল্ট্যান্ট লিমিটেড, কিসওয়া এন্টারপ্রাইজ, আমান এন্টারপ্রাইজ, রমনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড কনসালট্যন্সি, প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেড ও কাশীপুর ওভারসিজ।

দুদক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারের চুক্তির আওতায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১০টি নির্ধারিত রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাত। বিভিন্ন অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে আবার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে দেশটি। ওই সমঝোতায় শ্রমিক পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০টি করা হয়। ২০২২ সালে সরকারি আদেশে শ্রমিক ভিসায় মালয়েশিয়া যেতে শ্রমিকপ্রতি সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা ফি নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেখানেও তৈরি হয় নতুন সিন্ডিকেট। মালয়েশিয়াগামী প্রত্যেকের কাছ থেকে নির্ধারিত খরচের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করেন ১০০ এজেন্সির মালিক ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের (লোটাস কামাল) পরিবারসহ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেয় ২০-২৫টি এজেন্সি। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষে অনেকেই মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। অনেকেই ছাড়পত্র পাননি, বাকিরা ছাড়পত্র পেলেও মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার সম্মতি না পেয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এভাবে এজেন্সিগুলো ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়াগামী প্রায় পাঁচ লাখ ব্যক্তির কাছ থেকে নির্ধারিত খরচের অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের মাধ্যমে আত্মসাৎ করে।

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে দুর্নীতির বিষয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি বেনজীর আহমদ ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চলতি বছরের শুরুর দিকে দুদকে অনেক অভিযোগ আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে জোর তৎপরতা শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১১ মার্চ প্রথমবারের মতো মামলা করে দুদক। এতে ৬৭ হাজার ৩৮০ জনের কাছ থেকে ১ হাজার ১২৮ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ১২টি এজেন্সির ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ১২টি মামলা করা হয়। এজেন্সিগুলো হলো অরবিটাল এন্টারপ্রাইজ, অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল, স্নিগ্ধা ওভারসিজ, আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল, বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, বিএম ট্রাভেলস, বিএনএস ওভারসিজ, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড ও দ্য ইফতি ওভারসিজ।

এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর ১৩ এজেন্সির ৩১ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ১৩টি মামলা করে দুদক। এতে ৬৯ হাজার ২৪৩ জনের কাছ থেকে ১ হাজার ১৫৯ কোটি ৮২ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এজেন্সিগুলো হলো আকাশ ভ্রমণ, উইনার ওভারসিজ, শাহীন ট্রাভেলস, নাভিরা লিমিটেড, আদিব এয়ার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, ইউনাইটেড ম্যানপাওয়ার কনসালট্যান্স, গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ, পিআর ওভারসিজ, জাহরত অ্যাসোসিয়েটস, অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং, জান্নাত ওভারসিজ, মিডওয়ে ওভারসিজ ও সাউথ পয়েন্ট ওভারসিজ।

গত ৬ নভেম্বর ৩ হাজার ৩৩১ জনের কাছ থেকে ৫২৫ কোটি ২২ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি এজেন্সির ১১ জনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করে দুদক। এজেন্সিগুলো হলো আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, ইম্পেরিয়াল রিসোর্সেস, আরআরসি হিউম্যান রিসোর্স সার্ভিস ও থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল।

১১ নভেম্বর ৩১০ কোটি ৯৩ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির পাঁচজনের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। এজেন্সিগুলো হলো সেলিব্রিটি ইন্টারন্যাশনাল, অদিতি ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল এবং আর ভিং এন্টারপ্রাইজ।

১৩ নভেম্বর ৩১৪ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচটি রিক্রুটিং এজেন্সির ২২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক পাঁচটি মামলা করে দুদক। এজেন্সিগুলো হলো এমএস জিএমজি ট্রেডিং, জিএমজি অ্যাসোসিয়েট, কিউকে কুইক এক্সপ্রেস, এমইএফ গ্লোবাল ও দাহমাসি করপোরেশন।