গাজীপুর কণ্ঠ, লাইফস্টাইল ডেস্ক : নতুন বছর মানেই নতুন করে ভাবা, নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার এক স্বাভাবিক তাগিদ। পুরানো বছরের ভুলত্রুটি, অপূর্ণতা আর আক্ষেপ পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে অনেকেই নতুন বছরের শুরুতে কিছু সংকল্প ঠিক করেন।
তবে বাস্তবতা হল উদ্দীপনা যতটা জোরালো থাকে বছরের শুরুতে, অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই ফিকে হয়ে যায় সেটা।
তাই নতুন বছরে সংকল্প নেওয়ার সময় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল- বাস্তবতা, আত্মজ্ঞান ও ধারাবাহিকতা।
নতুন বছরের সংকল্প আসলে কী
নতুন বছরের সংকল্প শুধু একটি সামাজিক রীতি নয়; এটি আত্মউন্নয়ন ও আত্ম-পরিবর্তনেরও মাধ্যম।
মনস্তাত্ত্বিক-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘কাম ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন চিকিৎসক ক্রিস মওসনিক বলেন, “বছরের শুরু মনে এক ধরনের নতুন সূচনার অনুভূতি তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের কারণে অনেকেই নিজের সক্ষমতা, সময় ও পরিস্থিতি না ভেবেই খুব বড় লক্ষ্য ঠিক করে ফেলেন। কখনও দৌড়ানোর অভ্যাস না থাকলেও ম্যারাথন দৌড়ানোর সিদ্ধান্ত, কিংবা দীর্ঘদিন লেখালেখি না করেও বই লেখার সংকল্প- এসবই অনেক সময় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
তাই সংকল্প সফল করতে হলে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও নিজের জীবনের সঙ্গে মানানসই লক্ষ্য নির্ধারণ।
যে কারণে বেশিরভাগ সংকল্প টেকে না
“সংকল্প ভেঙে যাওয়ার প্রধান কারণ হল অতিরিক্ত চাপ এবং অস্পষ্ট লক্ষ্য”- মন্তব্য করেন ডা. মওসনিক।
কীভাবে, কখন, কতটা- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে সংকল্প ধীরে ধীরে ঝুলে পড়ে। পাশাপাশি অনেক সময় লক্ষ্য নেওয়া হয় সমাজ বা অন্যের প্রত্যাশা থেকে, নিজের ভেতরের চাহিদা থেকে নয়।
নিজের প্রয়োজন ও আগ্রহ থেকে নেওয়া লক্ষ্যই দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ হয়।
লক্ষ্য নির্ধারণে বাস্তবতা জরুরি
নতুন বছরে সংকল্প নিতে হলে নিজের বর্তমান জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক অবস্থান, সময় ব্যবস্থাপনা সবকিছু মাথায় রাখতে হবে।
বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করলে তা অনুসরণ করা সহজ হয়। লক্ষ্য পূরণের পুরো যাত্রাটাই একটি শেখার প্রক্রিয়া এটি উপলব্ধি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আগ্রহ ও আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া
যে কাজে আনন্দ নেই, সে সংকল্প টিকবে না এটাই বাস্তব সত্য। তাই নতুন বছরে নিজের পছন্দের কাজের জন্য নিয়মিত সময় রাখা হতে পারে দারুণ একটি সংকল্প।
ছবি আঁকা, গান করা, বাগান করা কিংবা কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখা- এসব কাজে নিয়মিত যুক্ত থাকলে মানসিক প্রশান্তি বাড়ে এবং জীবনের প্রতি আগ্রহও গভীর হয়।
শরীরচর্চা হোক আনন্দের
শরীরচর্চা মানেই কেবল ওজন কমানো বা শরীরের গড়ন বদলানো নয়। নাচ, হাঁটা, পাহাড়ে চড়া বা যোগব্যায়ামের মতো যে কোনো উপভোগ্য চলাচল শরীর ও মনের জন্য উপকারী।
চলাফেরাকে আনন্দের অংশ বানাতে পারলে তা অভ্যাসে পরিণত হয়।
ডা. মওসনিক বলেন, “শরীরের কথা শুনে নড়াচড়া করাই সুস্থতার মূল।”
প্রযুক্তি থেকে বিরতি
প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানসিক চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তাই সপ্তাহে বা মাসে নির্দিষ্ট একটি দিন প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার সংকল্প মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।
ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়াই সময় কাটালে নিজের সঙ্গে সংযোগ বাড়ে, সম্পর্কও গভীর হয়।
সম্পর্ক ও মানবিকতা চর্চা
অপরিচিত কাউকে সাহায্য করা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়া— এসব কাজ জীবনে অর্থপূর্ণ অনুভূতি আনে।
সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার এই অনুভূতিই অনেক সময় মানুষকে মানসিকভাবে শক্ত রাখে।
কৃতজ্ঞতার অভ্যাস
প্রতিদিন রাতে দিনের একটি ভালো মুহূর্ত লিখে রাখা বা মনে করা। এই ছোট অভ্যাস মনোভাব বদলে দিতে পারে।
কৃতজ্ঞতা চর্চা হতাশা কমায় এবং জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো চোখে আনে।
নিজের সঙ্গে সদয় হওয়া
নিজের সঙ্গে নেতিবাচক ভাষায় কথা বলা অনেকেরই অজান্তে অভ্যাসে পরিণত হয়।
নতুন বছরে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার সংকল্প মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে এই চর্চা থেকেই।
ধ্যান ও নীরবতার চর্চা
মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান কার্যকর একটি উপায়। অল্প সময়ের শ্বাস-প্রশ্বাসভিত্তিক ধ্যানও মন শান্ত করতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানসিক সুস্থতা প্রশিক্ষক ও ধ্যান শিক্ষক জে শেট্টি একই প্রতিবেদনে বলেন, “ভয় ও অস্থিরতা বোঝার জন্য নীরবতার চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ধারাবাহিকতাই আসল বিষয়
নতুন বছরের সংকল্প সফল করার সবচেয়ে বড় শর্ত হল ধারাবাহিকতা। একদিন ব্যর্থ হলে নিজেকে দোষারোপ না করে আবার শুরু করার মানসিকতা রাখতে হবে।
প্রয়োজন হলে লক্ষ্য সামান্য বদলানো যেতে পারে। জীবন অনিশ্চিত এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই সংকল্প এগোলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।