মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিল ইরান

মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিল ইরান

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র যেন সামরিক হস্তক্ষেপ না করে—সে বিষয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে ইরান। এমন প্রেক্ষাপটে, তেহরান এই হুঁশিয়ারি দিল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের “সহায়তা দিতে প্রস্তুত”।

টানা দুই সপ্তাহের ব্যাপক বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ হুমকি তৈরি করেছে। এ অবস্থায় মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে। তবে তাদের খবরে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও হোয়াইট হাউস কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, সে ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ইরানিদের “উদ্ধারে” প্রস্তুত—এ কথা ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ইরান হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে।” তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত”।

ট্রাম্পের এসব মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানের সরকার বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন জোরদার করেছে। এরপরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় এই বিক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তেহরানকে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার গোষ্ঠী হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১৬ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানায়, ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব করতে পারে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। বৃহস্পতিবার থেকে ইরান কার্যত বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, কারণ সরকার ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থগিত করেছে।

এরমধ্যে আজ রোববার দেশটির পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে “ভুল হিসাব” না করার হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক এই কমান্ডার বলেন, “স্পষ্ট করে বলতে চাই—ইরানের ওপর হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড [ইসরায়েল] এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।”

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। গত জুনে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্বল্প সময়ের জন্য যুক্ত হওয়ার পর এই হামলা করা হয়।

তার আগে গতকাল শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। ইরানি কর্তৃপক্ষ বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব বিক্ষোভ উসকে দিচ্ছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে অন্য দেশগুলোর মতো মনে করে যুক্তরাষ্ট্র একই কৌশল অনুসরণ করছে—কিছু ব্যক্তিকে উসকে দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও দাঙ্গা তৈরির চেষ্টা করছে।”

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাঁর বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে জানায়, ইরানি জনগণ “দেশ ও [ইসলামি] শাসনব্যবস্থাকে আগের চেয়েও দৃঢ়ভাবে সমর্থন করবে।”

প্রসঙ্গত, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অতীতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে ওমান।

এই অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে—একদিকে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ চাপ, অন্যদিকে চড়া মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষুব্ধ ও হতাশ জনতার ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে। তবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সরকারি দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা এখনও রাস্তায় নেমে আসছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, আটক ব্যক্তিদের দ্রুত এবং কোনো ধরনের শৈথিল্য ছাড়াই বিচার করা হবে। তেহরানের রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি জানিয়েছেন, যারা অস্ত্র হাতে সরকারি ভবন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে “খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ” করার অভিযোগ আনা হবে—যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

ইরানের সরকার সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম জানিয়েছে, শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্য নিহত হয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, রোববার ইসফাহান প্রদেশের গভর্নর জানান, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে ৩০ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা “সশস্ত্র গোষ্ঠী” কয়েকটি প্রদেশে “সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে” হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে, যার মধ্যে মসজিদও রয়েছে।