কোনো ভোট ডাকাত আসলে ছেড়ে দেবেন না: গাজীপুরে জামায়াতের আমির

বিশেষ প্রতিনিধি : আসন্ন নির্বাচনে ভোট রক্ষায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘কোনো ভোট ডাকাত আসলে ছেড়ে দেবেন না। আমার ভোট আমি দেব, তোমারটাও আমি দেব—এই দিন শেষ।’
মঙ্গলবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গাজীপুরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ি মাঠে জামায়াত আয়োজিত ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা কোনো দলীয়, কোনো পারিবারিক, কোনো গোষ্ঠীগত সরকার আর এদেশে দেখতে চাই না। এরা বারবার ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে। ব্যাংক ডাকাতি করেছে, শেয়ার মার্কেট লুট করেছে, দুর্নীতির মহারাজ্যে পরিণত করেছে।’
পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘রাজার ছেলে রাজা—রাজনীতির এ ধারা পাল্টে দেব ইনশাআল্লাহ। একজন শ্রমিক ভাই-বোনের সন্তান যদি মেধাবী হয়, তার মেধা বিকাশের দায়িত্ব নেবে সরকার-রাষ্ট্র। আমরা চাই তাদের মধ্য থেকেও আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী বের হয়ে আসুক।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘গাজীপুরের সাতটি দাবি আমার কাছে দেওয়া হয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি, আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে রেলক্রসিংয়ের ওপর ওভারপাসসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান করব ইনশা আল্লাহ। অনেকে বলতে পারেন এত টাকা কোথায় পাবেন; টাকা আছে ওই চোরদের কাছে, যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে। ইনশা আল্লাহ আল্লাহ সুযোগ দিলে ওদের পেটের ভেতর থেকে টাকা বের করে এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করব। আমরা নিজেদের ভাগ্য বদলের জন্য নয়; বরং ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য উন্নয়ন করব।’
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের জুলাই যোদ্ধারা বলেনি চাঁদা দাও, বেকার ভাতা দাও। বলেছিল আমার হাতে কাজ দাও। আমি কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কারও কাছে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে অপমানিত করব না। সুশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যুবসমাজের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের হাত বানাব। কাজ তুলে দিয়ে বলব—এটাই বাংলাদেশ। এবার বাংলাদেশকে গড়ে দাও।’
স্বাধীনতার পর দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই ৫৪ বছরে দেশের কোনো উন্নয়ন হয়নি—একথা আমি বলি না। কিন্তু জনগণের উন্নয়ন করতে গিয়ে রডের বদলে বাঁশ, সিমেন্টের বদলে ছাই ব্যবহার করা হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতায় বসেছিলেন তখন যে পরিমাণ সম্পদশালী ছিলেন, ৫, ১০, ১৫ বছর পরে এ সম্পদ সাতশ-আটশ গুণ বেড়ে গেছে। সবার শ্বশুরবাড়ির সম্পদ হু হু করে বেড়েছে।’
গাজীপুরের শিল্পএলাকায় শ্রমিকদের অধিকার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘এই শিল্পএলাকায় কমপক্ষে ৪০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। কিন্তু তাদের জীবনে না আছে নিরাপত্তা, না আছে শৃঙ্খলা, না আছে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার।’
তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সম্মান দেওয়া হয় না। বিশেষ করে মা-দের সম্মান দেওয়াই হয় না। তাদের সেখানে বেতন বৈষম্য আছে। কাজ সমান কিন্তু পুরুষের এক ধরনের আর মহিলাদের আরেক ধরনের বেতন। সমস্ত বৈষম্যকে সমান করে ফেলব।’
শ্রমিক মায়েদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারী মায়েরা পাঁচ ঘণ্টা কাজ করবেন। বাকি তিন ঘণ্টার বেতন দেবে সরকার—সমাজসেবা অধিদপ্তর। এটা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পএলাকায় আমরা সংখ্যা নির্ধারণ করে দেব। যে এত সংখ্যক মহিলা থাকলে সেখানে অবশ্যই বাচ্চাদের জন্য “ডে-কেয়ার সেন্টার” থাকতে হবে।’
প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আমাদের অঙ্গীকার দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার। আরেকটা দলও একই কথা বলছে। কিন্তু ৪৯ জন ঋণখেলাপিকে বগলের নিচে নিয়ে নির্বাচন করছেন। আগে তাদেরটা বাতিল ঘোষণা করেন।’
তিনি বলেন, ‘যদি সাহসিকতার সঙ্গে এটা করতে পারেন, জনগণ কিছুটা বিশ্বাস করবে—হ্যাঁ, উনাদের সদিচ্ছা আছে। আর যদি ঋণখেলাপিদের বগলের নিচে রেখে বলেন আমরা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ব, তাহলে বিষয়টা এমন হবে—আপনারা যা বলেন তা করেন না আর যা করেন তা বলেন না।’
সাম্প্রতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘কিছু মানুষের মাথা গরম হয়ে গেছে। মাঘ মাসে মাথা এত গরম কেন? তাহলে চৈত্র মাসে কী হবে? এখানে হামলা, ওখানে হামলা। এখানে আগুন, ওখানে খুন। শেষ পর্যন্ত কাউকে না পেলে নিজেরটাই খুন করে।’
তিনি বলেন, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে। তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে—এখনই জাতিকে জানিয়ে দিচ্ছে। একটা মানুষ নিরাপদে বাংলাদেশে থাকতে পারবে না। একজন ব্যবসায়ী নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবে না। একজন শ্রমিক নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না। একজন কৃষক শান্তিতে তার মাঠে ফসল ফলাতে পারবে না।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘এই অশান্তির বিপক্ষে আমাদের শান্তির আওয়াজ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সততার আওয়াজ। বেকারত্বের বিরুদ্ধে কাজের আওয়াজ।’
জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা উত্তর অঞ্চলের টিম সদস্য মাওলানা হোসাইন, গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমির ডক্টর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও মহানগরের নায়েবে আমির মো. হোসেন আলী, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আনিসুর রহমান বিশ্বাস, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ও কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য খায়রুল হাসান, আজহারুল ইসলাম মোল্লা ও মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।



