ইরান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় ট্রাম্পের পরাজয়ের শঙ্কা

ইরান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় ট্রাম্পের পরাজয়ের শঙ্কা

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধ গভীরভাবে অজনপ্রিয়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সহজে আটকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো উৎফুল্ল। এই সফল অভিযান শুধু ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণই ট্রাম্পকে দেয়নি, কিউবাকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগও করে দিয়েছে। ১৯৫৯ সাল থেকে ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটানোর স্বপ্নও এখন তাঁকে উজ্জীবিত করছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে যৌথ অভিযানেও ট্রাম্প একই সাফল্যের প্রত্যাশায় আছেন। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সত্ত্বেও তাঁর আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরেনি।

সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হলে তেলের দাম দ্রুত কমবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এটুকু মূল্য অতি সামান্য। শুধু বোকারাই ভিন্নমত পোষণ করবে!”

শুল্কের দেয়াল, ফেডারেল কর্মী ছাঁটাই, অভিবাসী শ্রমিক বহিষ্কার ও ফেডারেল রিজার্ভের ওপর অবিরাম চাপের পরেও কয়েক সপ্তাহ আগেও মনে হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হয়তো উচ্চ মূল্যস্ফীতির যুগ থেকে সফটভাবে বেরিয়ে আসতে পারবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। দেশীয় উৎপাদন বাড়ায় অপরিশোধিত তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৭৩ সালের তেল সংকটে মোট শক্তি চাহিদার প্রায় ৪৮ শতাংশ পূরণ করত তেল, এখন তা নেমে এসেছে ৩৮ শতাংশে। একই সময়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের অংশ ৩০ থেকে বেড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে এবং কাতার তরলীকৃত গ্যাস কেন্দ্র বন্ধ করে দিলে ইউরোপীয় বাজারে বড় ধাক্কা লাগলেও ট্রাম্পের প্রিয় সূচক এস অ্যান্ড পি ৫০০ এখনো সর্বকালের সর্বোচ্চের কাছাকাছি রয়েছে।

তবে ট্রাম্পের আসল পরাজয় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে নয়। পরাজয় আসছে আমেরিকার জনমতের কাছ থেকে, যে শক্তি ঐতিহাসিকভাবে সব আমেরিকান সামরিক অভিযানের গতিপথ নির্ধারণ করেছে।

শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধ ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। এমনকি সাধারণত যুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল মার্কিন জনমতও এবার ভিন্ন। আর এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতে সেই অজনপ্রিয়তা আরও বাড়াবে।

বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম নির্ধারিত হয়, তা টেক্সাস থেকেই আসুক বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে পেট্রোলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে—গ্যালনপ্রতি সাড়ে তিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি পূর্বাভাস বলছে, পেট্রোলের দাম ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এবং ডিজেলের দাম অন্তত আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধপূর্ব স্তরে নামবে না।

পরিবহন কোম্পানিগুলো বাড়তি জ্বালানি খরচ সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেবে। কৃষকেরা জ্বালানি ও সার বাবদ বাড়তি খরচ যোগ করবেন খাদ্যপণ্যের দামে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি ফেব্রুয়ারির ২.৪ শতাংশের ওপরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুদের হার কমানোর পরিকল্পনাও ঝুলে পড়বে। আমেরিকানদের প্রিয় এসইউভির বিক্রিতেও ধস নামতে পারে।

পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ট্রাম্প তেলের দাম কমাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার বিমাকরণ ও নৌ-এসকর্টের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। রাশিয়ার কিছু তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর পথও খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় তেলের দাম বৃদ্ধি উল্টাতে এটুকু যথেষ্ট নয়। যুদ্ধ হয় বন্ধ হতে হবে, নয়তো ইরানের সক্ষমতা এতটাই ধ্বংস করতে হবে যে হরমুজ প্রণালিতে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা তার না থাকে।

ট্রাম্প একই সঙ্গে বলছেন ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ নিশ্চিত করবেন এবং যুদ্ধ ‘প্রায় শেষের পথে’। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, আকাশপথে যতই বোমাবর্ষণ হোক, বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ বাহিনীর হাজার হাজার সশস্ত্র যোদ্ধা সহজে অস্ত্র ছাড়বে না।

ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ খোলা: নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি থেকে সরে এসে বিজয় ঘোষণা করা; স্থল বাহিনী মোতায়েন করা; কিংবা বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখা। তিনটি পথের কোনোটিই দ্রুত ফল দেওয়ার নয়।

মাদুরোকে ধরা সহজ ছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের নেতৃত্ব গুঁড়িয়ে দেওয়া সব জায়গায় সমান কার্যকর হয় না—এই শিক্ষা ট্রাম্পকে হয়তো শীঘ্রই নিতে হবে।