ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: শান্তি প্রস্তাব ‘একপেশে’, আলোচনা কি আদৌ সম্ভব?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: শান্তি প্রস্তাব ‘একপেশে’, আলোচনা কি আদৌ সম্ভব?

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। ওয়াশিংটনের পাঠানো ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবকে ‘একপেশে ও অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। এর পাল্টায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—চুক্তি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো মার্কিন প্রস্তাব বুধবার রাতে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন।

রয়টার্সকে দেওয়া বিবৃতিতে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবটি সফলতার ন্যূনতম শর্তও পূরণ করে না এবং এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে।

তবে ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হয়েছে। তেহরান এখন দাবি করছে—ভবিষ্যৎ সামরিক হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ। এর পাশাপাশি লেবাননকেও যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান।

মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নিশ্চিত করেছেন, যুদ্ধ অবসানের ভিত্তি হিসেবে এই ১৫ দফা তালিকা পাঠানো হয়েছিল। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এতে মূলত তিনটি বড় দাবি রয়েছে—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ছেড়ে দেওয়া।

একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘সর্বোচ্চ’ অবস্থান নিয়েছে এবং ওয়াশিংটন আসলে যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে নাকি সম্ভাব্য স্থলঅভিযানের আগে বাজার শান্ত রাখতে চাইছে, তা স্পষ্ট নয়।

হোয়াইট হাউসের মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামনে সুযোগ রয়েছে পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করার। তবে চুক্তি না হলে পরিণতির ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা তাদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠব।”

ট্রাম্প ইরানকে ‘দুর্দান্ত আলোচক’ বললেও স্বীকার করেন, তিনি নিজেও নিশ্চিত নন চুক্তিতে রাজি হবেন কি না। এ ছাড়া ইরানের তেলসম্পদ দখলকেও একটি বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি, যদিও বিস্তারিত কিছু জানাননি।
হাজার হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে, যা স্থলঅভিযানের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানি কার্যত বন্ধ করে দেয়। তবে সম্প্রতি কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

একটি থাই তেলবাহী জাহাজ কূটনৈতিক সমন্বয়ের পর প্রণালি পার হতে পেরেছে। মালয়েশিয়াও জানিয়েছে, তাদের জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো স্পেনকেও একই সুবিধা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।

ট্রাম্প আলোচনায় সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে ১০টি তেলবাহী জাহাজ—যার মধ্যে কিছু পাকিস্তানি পতাকাবাহী—প্রণালি পার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ বার্তা বিনিময় চলছে। তুরস্ক ও মিসরও মধ্যস্থতায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

পাকিস্তানের অনুরোধে ইসরায়েল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফকে হত্যার তালিকা থেকে সরিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছে একটি পাকিস্তানি সূত্র। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বৃহস্পতিবার ইরান তেলআবিব, হাইফাসহ ইসরায়েলের একাধিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তেলআবিবে আঘাত করে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়, যাতে বাড়িঘর ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তরের শহর নাহারিয়ায় হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।
ইরানে পাল্টা হামলায় বন্দর আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকা এবং শিরাজের উপকণ্ঠে দুই কিশোর ভাই নিহত হয়েছে। ইসফাহানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনেও আঘাতের খবর পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌ-কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও অনেক লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত রয়েছে।

যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছায়। বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দরপতন হয়। প্লাস্টিক, প্রযুক্তি, খুচরা বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।


সূত্র: রয়টার্স