গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : স্থানীয় সরকার কাঠামোয় ঢালাওভাবে প্রশাসক না বসিয়ে বরং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার দিকে ঝুঁকছে বিএনপি সরকার। চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসছে সরকার। প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় সরকার সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। দলের সিনিয়র নেতা, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মতামতের ভিত্তিতে চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পথরেখা তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন শুরু করে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে সব পর্যায়ের নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলাপকালে জানা গেছে, দলের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে আইনগত জটিলতার কারণে নির্বাচন আয়োজনে কিছুটা সময় লাগছে বলেও তিনি জানান।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, সে বিষয়ে জাতীয় সংসদ থেকে সিদ্ধান্ত আসার পরই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা হয়নি। তবে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা প্রশাসক নিয়োগের ব্যাপারে দলীয় ফোরামে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। এটা সম্পূর্ণ সরকারের বিষয়।’
উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ না দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে সরকার। সর্বশেষ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ১৪টি এবং গত ১৫ মার্চ ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচটি জেলায় প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এতে মোট ৬১টি জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা সরকারের জন্য সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিয়োগ পাওয়া সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং বেশির ভাগই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে।
সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটও এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু করতে চায় সরকার। বিভাগ ধরে ধরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে। এরপর ধারাবাহিকভাবে উপজেলা ও পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন কিছুটা দেরিতে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ এই দুই স্তরে ইতিমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা নেই।
যেসব জায়গায় বর্তমানে উপজেলা ও পৌরসভায় ইউএনও বা এসি ল্যান্ড প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না—এটা অনেকটাই নিশ্চিত। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করেন, দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচনের কারণে বিগত স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে এবং গ্রামীণ সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। দলীয় প্রতীক তুলে দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে চায় দল।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচন আয়োজনে আইনি জটিলতা আছে কি না, তা জানতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও চাওয়া হয়েছে।
জুন-জুলাই মাসে তীব্র গরম এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বর্ষার মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নজির কম। এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শেষ হবে। এরপর ব্যবহারিক পরীক্ষা চলবে ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। জুন-জুলাইয়ে শুরু হবে এইচএসসি পরীক্ষা।
সরকার সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, পরীক্ষার মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। এ ছাড়া গরম ও বর্ষায় ভোটাররা ভোট দিতে উৎসাহ পান না। সব দিক বিবেচনায় শীতকালকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সারা দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো ভেঙে দেয়।
এরপর থেকে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলো বহাল থাকলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত অধিকাংশ চেয়ারম্যান পলাতক থাকায় সেখানেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সূত্র: খবরের কাগজ