গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে শিগগিরই ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান, সেটা মোটামুটি স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের সঙ্গে যে যুদ্ধ বাধিয়েছে, তা ট্রাম্পের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ চীন সফরেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
যুদ্ধের কারণে তিনি সফর পিছিয়ে মে মাসের মাঝামাঝিতে নিয়ে গেছেন। ট্রাম্প হয়ত ভাবছেন, এরমধ্যে ইরান যুদ্ধের একটা রফাদফা হয়ে যাবে।
গেল ২৬ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি দাবি করেন, ইরানের অধিকাংশ সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে, যা তিনি দেখছেন ‘উচ্চমাত্রার সাফল্য’ হিসেবে।
আর গত এক বছরে ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিল ছেড়ে দুবার উঠে পড়া ট্রাম্প এখন এসে চাইছেন, তেহরানের সঙ্গে যেন একটা চুক্তি করা যায়।
ট্রাম্প হয়ত আশা করছেন, একটা চুক্তি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে যুদ্ধ থেকে সরে আসার পথ তৈরি করে দেবে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে গিয়ে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসবে এবং শেয়ারবাজার চাঙা হবে।
কিন্তু যুদ্ধ খুব কম ক্ষেত্রেই পরিপাটি বা নিখুঁতভাবে শেষ হয়। যেসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়, সেগুলোরও সমাধান হয় না। উল্টো নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটায়।
আর যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা আগাম বলা সবসময়ই কঠিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর চার সপ্তাহ পর কেউই অনুমান করতে পারেনি এর শেষটা কেমন হবে।
২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার প্রথম মাসেই তালেবান-নেতৃত্বাধীন সরকার ভেঙে পড়ছিল।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের শাসনব্যবস্থা পতন ঘটে। যদিও সাদ্দাম হোসেন আটক হন হামলা শুরুর নয় মাস পর।
আর চলমান ইরান যুদ্ধের এক মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের সামরিক সক্ষমতাকে মোটামুটি দুর্বল করে দিতে পেরেছে।
কিন্তু পাল্টা আঘাত হিসেবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে তারা।
ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুথিরা গত সপ্তাহেই অন্তত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের দিকে ছুড়েছে।
এসব হামলা ফের যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তার ঘটিয়েছে। এছাড়া হুথিরা লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে, যেটা তারা ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েল হামলা শুরুর পর করেছিল।
ট্রাম্পের উপদেষ্টারা প্রায়ই জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে একাধিক বিকল্প রয়েছে।
ট্রাম্প একই সময় মধ্যপ্রাচ্যে স্থলসেনা পাঠাচ্ছেন, আবার প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠাতে চাইছেন তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে।
তিনি বলেছেন, আলোচনা চলাকালীন ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানো হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের হাতে বর্তমানে চারটি পথ রয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই তার মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ তেহরানের শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করার ধারেকাছেও নেই।
ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং তেহরানের সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দুর্বল করার ঘোষণাও দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
দ্য আটলান্টিক লিখেছে, ট্রাম্পের হাতে থাকা সব বিকল্পই বিপদে ভরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার ফিবার বলেন, “আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) ইরানের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছি ঠিকই। কিন্তু এই বার্তাও দিচ্ছি যে, আমরাও চাপে আছি এবং আমাদের সেটা ভালো লাগছে না।
“এতে করে ইরান বুঝে ফেলেছে যে, টিকে থাকাটাই হবে তাদের প্রধান কৌশল এবং এই কৌশলই তাদের জয় এনে দেবে।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জননীতি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “ইরানের বর্তমান হিসাবটা হলো, তারা যত বেশি দিন যুদ্ধে টিকে থাকবে, তত ভালো চুক্তি তারা করতে পারবে। তাদের এই হিসাবটাই আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।”
স্থলবাহিনী পাঠিয়ে সুফল মিলবে?
ইরানে স্থলবাহিনী পাঠিয়ে জ্বালানি স্থাপনাগুলো দখল করতে পারেন ট্রাম্প, যেন তেহরানকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলে চুক্তিতে বাধ্য করা যায়।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, সংঘাত বাড়িয়ে তুলে, এমনকি প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে পিছু হটানোর চিন্তা ছিল রাশিয়ার।
পেন্টাগনের নীতিপত্রে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল ‘সংঘাত বাড়িয়ে সংঘাত থামানোর’ মতবাদ হিসেবে।
প্রায় চার দশক পরে এসে পেন্টাগনের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে উত্তেজনা বাড়াতে স্থলবাহিনী পাঠানো হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন পর্যন্ত অন্তত আট হাজার সেনা মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ৮২ পদাতিক বাহিনীর সদস্যরাও আছেন, যারা চলতি সপ্তাহে ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে শুরু করেছেন।
মার্কিন নৌবাহিনী ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাও আছেন। তবে তাদের গন্তব্য বা মিশন সম্পর্কে পেন্টাগন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে ফিনান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, “হয়ত আমরা খার্ক দ্বীপ দখল করে নেব, হয়ত নেব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে।”
খার্ক দ্বীপের অবস্থান ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে। ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ থেকে ছাড় হয়।
যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ মার্চ খার্কে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এখন নতুন করে আবার সেখানে হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছেন ট্রাম্প।
খার্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হিসাবটা হলো, দ্বীপটি দখলে নিলে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে ইরান সরকার ট্রাম্পের কথা শুনতে বাধ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কর্পস জেনারেল কেনেথ এফ ম্যাকেঞ্জি বলেন, “আমরা এটা করতে পারি। বহু বছর ধরে আমরা এটি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেছি। কীভাবে আক্রমণ করে দখলে রাখা যায়, সে পরিকল্পনাও করেছি।”
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডে নেতৃত্ব দিয়ে আসা এ কর্মকর্তা বলেন, “আপনি ইরানের তেলনির্ভর অর্থনীতি বন্ধ করে দিতে পারেন; তাদের অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাবে। খার্ক দ্বীপ দখল করতে পারলে সেটিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।”
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান অনেক সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন, এই অর্থনৈতিক চাপ বিশ্ববাজারে যত দ্রুত পড়বে, ইরানের অর্থনীতিতে তত দ্রুত পড়বে না।
এছাড়া খার্ক দখলে নিলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা বেড়ে যেতে পারে। ওই দ্বীপ থেকে রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের দাম রাতারাতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও আছে।
ইরানে প্রায় হাজার বিশেক মানুষের বাস, যাদের অধিকাংশই তেল শ্রমিক। বেসমারিক এসব লোকজনের কারণে সেখানে হামলার পরিকল্পনা জটিল হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খার্ক দ্বীপ দখলে নিলে সেখানে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ইরান ড্রোন হামলা চালাতে পারে। মার্কিন সেনাদের আটক করার চেষ্টাও দেখা যেতে পারে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি খার্ক দখলে নিতে চায়, তাহলে কিছু সময় আমাদের সেখানে থাকতে হবে।”
এর পরিবর্তে হরমুজ প্রণালি সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র কাছাকাছি কয়েকটি দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে হরমুজ সচল করাটাই যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে না। কারণ, যুদ্ধের আগে সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকই ছিল।
অবশ্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র একাই নেবে না বলে মঙ্গলবার আভাস দিয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রুথ সোশালে তিনি লিখেছেন, অন্য দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থে লড়াই করা শিখতে হবে।
“যুক্তরাষ্ট্র আর তোমাদের পাশে থাকবে না, যেমন তোমরাও ইরানে হামলার ক্ষেত্রে আমাদের পাশি ছিলে না। নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ কর।”
খার্ক দ্বীপের বাইরে আরেকটি স্থল অভিযানের বিবেচনাও আছে ট্রাম্প প্রশাসনের। সেটা হলো, দেশটির উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম দখল করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি হবে অত্যন্ত জটিল এক সামরিক পদক্ষেপ। কারণ ইউরেনিয়াম ভূগর্ভে লুকানো থাকতে পারে।
কিন্তু এই অভিযান সফল হলে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করতে পারবে যে, তারা সবচেয়ে বড় হুমকি দূর করতে পেরেছে, যা আর কোনো মার্কিন সরকার পারেনি।
যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালে কী ঘটবে?
গেল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অন্তত ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
এর তিন দিন পর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রই রয়ে গেছে।
আর মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে গেল সপ্তাহে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে।
তারপরও ট্রাম্প ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে পুরোপুরি’ ধ্বংসের দাবি তুলে যুদ্ধের ইতি টানতে পারেন, যেমনটা তিনি গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও করেছিলেন।
ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিলে একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আবার হয়ত তাদের বিরুদ্ধে হামলা হতে পারে। 0
ইসরায়েল এই কৌশলকে বলে ‘ঘাসের আগা ছেটে ফেলা’, অর্থাৎ প্রতিপক্ষের সক্ষমতা সীমিত করে রাখা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়ে যেতে পারে, যেন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে অভিযান শুরু করতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন না পায়।
আলোচনার সুযোগও আছে
ইরানের সঙ্গে একটা চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগও ট্রাম্পের সামনে আছে।
আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও হামলা পাল্টা হামলা অবশ্য কমেনি। গেল বৃহস্পতিবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌপ্রধানকে হত্যা করে ইসরায়েল।
অন্যদিকে তেল আবিব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোতে ইরানও হামলা চালিয়েছে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প একবার ইরানের জ্বালানি শিল্পকে ‘সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ হুমকি দিচ্ছেন, আবার ইরানের তেল দখল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
আবার ট্রাম্প এ কথাও বলছেন যে, ইরান আলোচনায় বসতে আগ্রহী। তার ভাষায়, যুদ্ধ শুরুর আগে যেমনটা উচিত ছিল, তেহরান এখন সে সুরেই কথা বলছে।
আটলান্টিকের বিশ্লেষণ বলছে, যেকোনো আলোচনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক অবিশ্বাসের পাল্লাই ভারী থাকবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী জেয়ার্ড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বসতে অনীহা প্রকাশ করেছিল ইরান সরকার। কারণ নয় মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দুবার আলোচনার মাঝপথ থেকে সরে দাঁড়িয়ে ইরানে বোমা ফেলেছে।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধেও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে মার্কিন কর্মকর্তাদের। তারা বলছেন, তেহরান প্রকৃত অর্থে নিজেদের বদলাতে চায় না। তারা নিজেদের সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য আলোচনা দীর্ঘায়িত করে।
তবে যুদ্ধের কারণে উভয় পক্ষের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে।
কিন্তু তেহরানের যে পাঁচ দফা এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে ১৫ দফা, তাতে বিস্তর ফারাক। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তেহরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ত্যাগ করতে হবে; আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না; পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগের অঙ্গীকারও করতে হবে। যদিও তাদের ১৫ দফায় ইরানের জনগণের জন্য উন্নত শাসনব্যবস্থা নিয়ে কোনো কিছু বলা নেই।
অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ভবিষ্যতে হামলা চালাবে না, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিনিময়ে ফি আদায়ের কথাও বলছে তারা।
নিজেদের এসব দাবি-দাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষই অনড়। ফলে উভয়পক্ষের মধ্যে যেকোনো শান্তি আলোচনাই দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্প চাইলে হামলা চালিয়েও যেতে পারেন
দ্য আটলান্টিক লিখেছে, ট্রাম্পের হাতে সবশেষ উপায় হলো, ইরান আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত বা রাষ্ট্র ভেঙে না পড়া পর্যন্ত বোমা হামলা চালিয়ে যাওয়া।
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার লক্ষ্যবস্তু বিস্তৃত করে এবং বোমা হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের সরকার ভেঙে পড়তে পারে অথবা দেশটি টুকরো টুকরো হয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, তাতে এমনটা ঘটবেই, সেই নিশ্চয়তা নেই। বরং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকলে খরচও বাড়তেই থাকবে।
এক মাসের যুদ্ধেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে নজিরবিহীন ব্যাঘাত ঘটার তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা।
আবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের মজুদ কমছে, আর দেশটির ভোক্তারা মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করছেন।
বুধবারের বাজার দর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন ‘আনলেডেড’ পেট্রোলের গড় দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েনি। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতিদিনই পেট্রোল পাম্প বা মুদি দোকানে গিয়ে ‘কর’ দিতে হচ্ছে।
এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এই ‘কর’ ততই বাড়বে।
এছাড়া যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মাথায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে মার্কিনিদের রক্তও ঝরবে।
প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের অন্তত ৯০ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে থাকে, তাহলে অবশিষ্ট অংশ ধ্বংস করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত?
ইসরায়েল হয়ত নিরাপত্তার বিনিময়ে উচ্চ জ্বালানির দাম মেনে নিতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেটা ঘটবে না।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলোকে আরো চাপে ফেলে দেবে।
সূত্র: বিডিনিউজ