গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের আকাশ থেকে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে; এ খবরটি নিশ্চিত করা গেলে তা মার্কিন যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন সংযোজন বলে বিবেচিত হবে।
ইরানের কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পাইলটকে যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধার করেছে- এই খবর মিথ্যা এবং এটি “শত্রুর কৌশল”। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে গ্রেফতার করার খবর অস্বীকার করেছে তারা।
ইরানের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত চ্যানেলগুলো নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা “পাইলটকে জীবিত ধরে” এবং এর জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।
সিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিমানটির দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে খুঁজতে ইরানের গভীরে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে।
কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ বা সিএসএআর, অর্থাৎ যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র বাহিনীগুলোর জন্য সবচেয়ে জটিল ও সময়-সংবেদনশীল অভিযানের মধ্যে ধরা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে সংঘাতপূর্ণ যেসব এলাকায় বিমান ভূপাতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে সেখানে বিমান বাহিনীর বিশেষ দক্ষ ইউনিটগুলোকে যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার মিশনের জন্য আগাম মোতায়েন করা হয়।
কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কী?
কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশন এমন এক ধরনের সামরিক অভিযান যার লক্ষ্য হচ্ছে বিপদে পড়া ব্যক্তিদের সহায়তা করা ও প্রয়োজনে উদ্ধার করা। যেমন ভূপাতিত পাইলট বা বিচ্ছিন্ন সৈন্যদের খুঁজে বের করা।
প্রচলিত অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানগুলো যেখানে মানবিক কার্যক্রম বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পরিচালিত হয়, সেখানে কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশনগুলো পরিচালিত হয় শত্রুভাবাপন্ন বা সংঘর্ষপূর্ণ পরিবেশে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের অভিযান শত্রু দেশের বৈরি এলাকাতেও ঘটতে পারে– যেমনটি গত শুক্রবার ইরানে পরিচালিত একটি উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করার দাবি করা হচ্ছে।
সাধারণত কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশনগুলো হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সহায়তায় থাকে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ও অন্যান্য সামরিক বিমান, যারা আক্রমণ পরিচালনা ও এলাকায় টহল দেয়।
প্যারা রেসকিউ জাম্পার স্কোয়াড্রনের প্রাক্তন একজন কমান্ডার সিবিএস নিউজকে জানান, ইরানে যে ধরনের উদ্ধার অভিযানের দাবি করা হচ্ছে, এরকম একটি অভিযানের অংশ হিসেবে কমপক্ষে ২৪ জন প্যারা রেসকিউ জাম্পার ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে করে এলাকাটি তন্ন তন্ন করে খুঁজবেন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে দলটিকে বিমান থেকে লাফ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় এবং মাটিতে নামার পর তাদের প্রথম কাজ হয় নিখোঁজ ক্রু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা।
সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, তাদের খুঁজে পাওয়ার পর প্যারা রেসকিউ জাম্পাররা প্রয়োজন হলে চিকিৎসা সহায়তা দেয়, শত্রুর নজর এড়িয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে উদ্ধার হওয়ার ব্যবস্থা করে।
প্রাক্তন কমান্ডার সিবিএস নিউজকে বলেন, “ভয়াবহ ও অত্যন্ত বিপজ্জনক এটা বললেও কম বলা হবে”।
তিনি আরও বলেন, “তারা বিমান বাহিনীর ‘সুইস আর্মি নাইফ’ নামে পরিচিত এবং এটি করার জন্য তারা প্রশিক্ষণ নেয়”।
শুক্রবার ইরান থেকে প্রকাশিত ভেরিফায়েড এক ভিডিওতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হেলিকপ্টার এবং কমপক্ষে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান দেশটির খুজেস্তান প্রদেশের আকাশে উড়ে যাচ্ছে।
এ ধরনের অভিযানগুলোতে সময় নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়, কারণ একই এলাকায় শত্রু বাহিনীও মোতায়েন থাকতে পারে, যারা কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দলের মতোই ওই মার্কিন সদস্যদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে চ্যাথাম হাউসের ইউএস অ্যান্ড নর্থ আমেরিকা প্রোগ্রামের পরিচালক লরেল র্যাপ বলেছেন যে, ওই ক্রু সদস্যকে আটক করা ইরানের জন্য একটি “বিশাল পুরস্কার” হবে এবং এটি তাদের একটি “অত্যন্ত শক্তিশালী দর কষাকষির হাতিয়ার” দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরের সাবেক স্পেশাল অপারেশন্স বিশেষজ্ঞ জোনাথন হ্যাকেট বিবিসি-র ওয়ার্ল্ড টুনাইট শো-তে বলেন, একটি উদ্ধারকারী দলের প্রধান অগ্রাধিকার হয় জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে বের করা।
“তারা সেই শেষ অবস্থান থেকে অনুসন্ধান শুরু করে যেখানে ব্যক্তিটিকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল এবং অত্যন্ত কঠিন এলাকায় ভিন্ন পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তি যে গতিতে চলতে পারত, তার ওপর ভিত্তি করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে,” বলেন তিনি।
হ্যাকেট বলেন, যেরমটা দাবি করা হচ্ছে, এ ধরনের উদ্ধার অভিযান “অপ্রচলিত সহায়তামূলক উদ্ধার অভিযান” হবে, যেখানে যেকোনো উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য সক্রিয় করা যেতে পারে এমন আপৎকালীন পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশে এলাকার থাকা অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ করা হয়ে থাকতে পারে।
কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশনের ইতিহাস
আকাশপথে যুদ্ধকালীন উদ্ধার অভিযানের ইতিহাস দীর্ঘ, যার সূচনা হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন পাইলটরা ফ্রান্সে ভূপাতিত সহযোদ্ধাদের উদ্ধার করতে আচমকাই অবতরণ করতো।
১৯৪৩ সালের একটি অভিযানের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্যারারেসকিউ ইউনিটগুলোর সূত্রপাত হয় যখন দুইজন কমব্যাট সার্জন (উদ্ধারকারী) বর্তমান মিয়ানমারে প্যারাশুটের মাধ্যমে নেমে আহত সৈন্যদের সাহায্য করেছিলেন।
স্মিথসোনিয়ানের এয়ার অ্যান্ড স্পেস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রথম হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযান সংঘটিত হয় মিয়ানমারের এ অভিযানের পর, যখন একজন মার্কিন লেফটেন্যান্ট জাপানি বাহিনীর ঘাঁটির পেছনের দিক থেকে চারজন সৈন্যকে উদ্ধার করেন।
এই ঘটনার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে হেলিকপ্টারের প্রথম কার্যকর ব্যবহারের নজিরও স্থাপিত হয়।
সংঘাত শেষ হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিক কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠন করা হয়। তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এর আধুনিক কার্যক্রমের সূচনা ঘটে।
“ব্যাট ২১” নামে পরিচিত একটি মিশনে, উত্তর ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ভূপাতিত একটি বিমানের পাইলটকে উদ্ধার করতে গিয়ে কয়েকটি বিমান ধব্বংস হয় এবং একাধিক মার্কিন সদস্য নিহত হয়। এই যুদ্ধ কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশনের পরিধি ও জটিলতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং তা সামরিক বাহিনীকে তাদের কৌশল ও কার্যপ্রণালী উন্নত করতে সহায়তা করে যা পরবর্তীতে উদ্ধার অভিযানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর প্যারা-রেসকিউ দল
সামরিক বাহিনীর সদস্যদের খুঁজে বের করা এবং উদ্ধার করার প্রধান দায়িত্বটি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর উপরেই বর্তায়। এই কাজটি মূলত পরিচালনা করে প্যারারেসকিউ জাম্পাররা, যারা সামরিক বাহিনীর বৃহত্তর স্পেশাল অপারেশনস কমিউনিটির অংশ।
যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রতিটি শাখাতেই সীমিত কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অভিযান পরিচালনা করার সক্ষমতা আছে।
প্যারারেসকিউ দলের অফিসিয়াল মন্ত্র হলো, “আমরা এই কাজগুলো করি, যাতে অন্যরা বেঁচে থাকতে পারে” এবং এ কাজকে মার্কিন সামরিক সদস্যরা একটি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে দেখে।
এই সদস্যরা যুদ্ধকালীন ও প্যারামেডিক (স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ) দুই ভূমিকাতেই অত্যন্ত দক্ষভাবে প্রশিক্ষিত এবং তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে কঠিন প্রক্রিয়াগুলোর একটি সম্পন্ন করে।
এই বাছাই ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই বছর সময় নেয়, তার মধ্যে রয়েছে প্যারাশুট ও ডাইভিং প্রশিক্ষণ, পানির নিচে বিধ্বংসী কার্যক্রমের মৌলিক শিক্ষা, বেঁচে থাকা, প্রতিরোধ এবং পালানোর প্রশিক্ষণ, পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক প্যারামেডিক কোর্স।
এই প্যারারেসকিউ জাম্পাররা যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসা, জটিল উদ্ধার অভিযান এবং অস্ত্র ব্যবহারের ওপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণও গ্রহণ করে থাকেন। মাঠপর্যায়ে, তাদের নেতৃত্ব দেন বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কমব্যাট রেসকিউ অফিসাররা, যারা উদ্ধার মিশনের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন।
সাম্প্রতিক মার্কিন উদ্ধার অভিযান
ইরাক-আফগানিস্তান যুদ্ধে প্যারারেসকিউ দলগুলো ব্যাপকভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে তারা হাজার হাজার মিশন পরিচালনা করে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধার করেছে।
২০০৫ সালের একটি অভিযানে বিমান বাহিনীর প্যারারেসকিউ দলগুলো একজন মার্কিন নেভি সিল সদস্যকে উদ্ধারে যুক্ত ছিল, যিনি আহত অবস্থায় আফগানিস্তানের একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
সেই হামলায় তার দলের অন্য তিনজন সদস্য নিহত হন। এ ঘটনাটির উপর পরবর্তীতে ‘লোন সার্ভাইভার’ নামের সিনেমাও নির্মাণ করা হয়।
গত কয়েক দশকে ভূপাতিত মার্কিন পাইলটদের উদ্ধার করার মিশন তুলনামূলকভাবে কমই ঘটেছে। ১৯৯৯ সালে, সার্বিয়ার আকাশে ভূপাতিত একটি এফ-১১৭ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের পাইলটকে প্যারারেসকিউ সদস্যরা উদ্ধার করেন।
১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় একটি বহুল আলোচিত ঘটনায়, মার্কিন পাইলট স্কট ও’ গ্র্যাডিকে একটি যৌথ বিমান বাহিনী ও মেরিন কোরের কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশনের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়, যখন তিনি ভূপাতিত হওয়ার পর ছয় দিন ধরে শত্রুর হাত থেকে লুকিয়ে ছিলেন।
সূত্র: বিবিসি