সিএনএন
মাত্র ছয় সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারে তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত ছিল, দাম ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এমন আচরণ করছে, যেন বিশ্ব তেলশূন্য হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের সভাপতি অ্যান্ডি লিপো বলেন, ‘এটি যত দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, পরিস্থিতি তত ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আজ হয়তো ঘাটতি নেই, কিন্তু একটা সময় অবশ্যই হবে। এই পথে চলতে থাকলে আমরা একদিন জ্বালানিশূন্য হয়ে পড়ব।’
ফিউচার্স ও স্পট মার্কেট—দুই জায়গাতেই লাল বাতি জ্বলছে।
চলতি মাসের শেষে ডেলিভারির চুক্তি পরবর্তী মাসের চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’, যা ইঙ্গিত দেয় বাজার দীর্ঘমেয়াদে তেল সরবরাহ নিয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছে।
চলতি বছরের মাত্র চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ফিউচার মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
তবে বাস্তব বাজারে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ভৌত তেলের মূল্য পরিমাপক ‘ডেটেড ব্রেন্ট’ গত সপ্তাহে ১৪১ দশমিক ২৬ ডলারে পৌঁছেছে—২০০৮ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের জ্বালানি কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, ‘এটি শেষ বোতলের পানির মতো: মানুষ যেকোনো দামে কিনতে রাজি। সরবরাহ সংকটের সময় ভৌত তেলের মূল্য নির্ধারণ বিজ্ঞানের চেয়ে শিল্পকলার বেশি।’
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে আরব লাইট ক্রুডের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১৯ দশমিক ৫০ ডলার এবং ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে ব্রেন্টের চেয়ে ৩০ ডলার পর্যন্ত বেশি দামে তেল বিক্রি করছে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের পকেটে। বিশ্লেষক লিপোর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন তাঁরা পেট্রোল, জেট জ্বালানি ও পরিবহন জ্বালানিতে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৮৩ কোটি ডলার ব্যয় করছেন।
তেলের বাজারের চেয়েও জটিল হয়ে উঠছে পরিশোধিত জ্বালানির সংকট।
গত এক মাসে জেট জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো সাধারণত মাত্র কয়েক দিনের জেট জ্বালানি মজুত রাখে। তার ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমান সংস্থাগুলো নিজস্ব মজুত ও হেজিং কার্যক্রম থেকে সরে এসেছে।
লিপো জানান, তিনি জেট জ্বালানি নিয়ে ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’। তবে তিনি সতর্ক করেন যে শিল্পটি জ্বালানিশূন্য হওয়ার অনেক আগেই বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল শুরু করবে।
সেই প্রবণতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস আগামী ছয় মাসে—গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মকালীন মৌসুমসহ—তাদের সময়সূচি ৫ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। একাধিক বিমান সংস্থা টিকিটের দাম বাড়িয়েছে এবং ব্যাগেজ চার্জ আরোপ করেছে। ইতালির কিছু বিমানবন্দর ফ্লাইটে জ্বালানি বরাদ্দে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।
হরমুজ প্রণালি আরও ছয় থেকে আট সপ্তাহ বন্ধ থাকলে ডিজেল এবং গ্রীষ্মকালীন ড্রাইভিং মৌসুম পর্যন্ত বন্ধ থাকলে পেট্রোলের সংকটও ঘটতে পারে বলে দ্বিবেদী আশঙ্কা করছেন।
এই সমস্যা সমাধান সহজ নয়। অপরিশোধিত তেল বিকল্প পথে পাঠানো গেলেও জেট জ্বালানি, ডিজেল ও পেট্রোল সাধারণত পাইপলাইনের মাধ্যমে শোধনাগার থেকে গুদামে পরিবহন করা হয়।
সরবরাহ পক্ষে চীন, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া তেল রপ্তানি সীমিত করেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে পেট্রোল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এশিয়ার মিয়ানমার ও বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদক ও শোধনকারী দেশ হওয়ায় এই সংকট থেকে কিছুটা সুরক্ষিত। তবে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
স্বতন্ত্র তেল বিশ্লেষক টম ক্লোজার বলেন, ‘এটি জাহাজের খোলে এক বিশাল ফাটলের মতো। সমস্যার শুরু এশিয়ায়, তারপর আফ্রিকা ও ইউরোপে ছড়াবে। এবং এক পর্যায়ে তা যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছাবে।’