গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পর্দার আড়ালে কূটনীতি প্রায়ই সবচেয়ে কার্যকর হয় — যখন কেউ দেখছে না, তখনই আসল কাজ হয়। গত দুই সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত যখন বিপজ্জনকভাবে বড় যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছিল, পাকিস্তান ঠিক তখনই সেই নেপথ্যে নিজেকে সক্রিয় রেখেছে।
বুধবার ভোরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা দিলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে — লেবাননসহ আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে — একটি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতে পাকিস্তান সফলভাবে ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এই চুক্তির পেছনে ঠিক কী ঘটেছিল?
শুরুটা হয়েছিল মার্চের শেষ সপ্তাহে
২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রথমবারের মতো যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ‘ব্যাপক আলোচনা সহজ করতে’ প্রস্তুত বলে জানালেন।
চার দিন পর, ২৮ মার্চ, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলো আক্রান্ত হওয়ার পরপরই পাকিস্তান নড়ে উঠল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বললেন — হামলার নিন্দা জানালেন, সংহতি প্রকাশ করলেন এবং ওয়াশিংটন ও আঞ্চলিক রাজধানীগুলোতে যোগাযোগের রূপরেখা দিলেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে কৃতজ্ঞতা জানালেন।
পরদিন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করলেন — উত্তেজনা প্রশমনের কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে।
৩১ মার্চ দার বেইজিং গেলেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠকের পর পাকিস্তান পাঁচ দফা উদ্যোগ ঘোষণা করল — উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পুনরুদ্ধারের প্রথম কাঠামোগত বহুপক্ষীয় প্রস্তাব।
এপ্রিলে সংঘাত আরও ভয়াবহ হলো
২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের একটি শতবর্ষী চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র, রাজধানীর কাছে একটি সেতু এবং একাধিক ইস্পাত কারখানায় হামলা চালাল। ইরান একাধিক মার্কিন বিমান ভূপাতিত করল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানালেন। হুমকি দিলেন ইরানকে ‘পাথর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার।
তবু ইসলামাবাদ পিছু হটল না — বরং তৎপরতা বাড়াল।
তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একের পর এক ফোনালাপ করা হলো। প্রতিটি যোগাযোগে পাক-চীন পাঁচ দফা উদ্যোগ তুলে ধরা হলো।
কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, তাৎক্ষণিক আলোচনা না হওয়ায় অনেকে মনে করেছিল পাকিস্তান সরে আসবে — কিন্তু ঘটল ঠিক উল্টোটা।
এর মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাকচি জানালেন, আলোচনার জন্য তিনি ইসলামাবাদ সফরে আসতে প্রস্তুত।
‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’: শেষ মুহূর্তের চুক্তি
৬ এপ্রিল পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাল একটি কাঠামোগত শান্তি প্রস্তাব — ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’।
প্রস্তাবটি ছিল দুই ধাপের:
প্রথম ধাপ: হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্তে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি। দ্বিতীয় ধাপ: ব্যাপক মীমাংসার জন্য ১৫ থেকে ২০ দিনের আলোচনার সুযোগ।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যাবতীয় বার্তা, সংশোধন ও আশ্বাস — সব যাচ্ছিল একটিমাত্র পথে: ইসলামাবাদ।
সেই রাতে প্রধান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটানা যোগাযোগ রাখলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচির সঙ্গে।
চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াটিও ছিল কৌশলী — পাকিস্তানের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকভাবে একযোগে। সরাসরি আলোচনার বাহ্যিক চেহারা এড়িয়ে দুই পক্ষ একই সময়ে প্রতিশ্রুতি দিতে পারল।
শেষ দুই ঘণ্টায় যা ঘটল
ট্রাম্পের রাত ৮টার (ইএসটি) সময়সীমার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে — যিনি আগের দিন বলেছিলেন ‘আজ রাতে একটা সভ্যতা ধ্বংস হবে’ — তিনি হঠাৎ সুর বদলালেন। বললেন, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত রাখা সম্ভব।
এর ঠিক আগেই শাহবাজ শরিফ প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সময়সীমা বাড়াতে অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে তেহরানকেও একই সময়ের জন্য প্রণালি খুলে দিতে বলেছিলেন।
সমস্যাটা ছিল সহজ, কিন্তু সমাধান কঠিন। ওয়াশিংটন চাইছিল তেহরান আগে নড়ুক। তেহরান চাইছিল আগে হামলা থামুক। কেউ প্রথম পা ফেলতে রাজি ছিল না।
পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ এই অচলাবস্থা ভাঙল — দুই পক্ষকে একই সময়ে, একযোগে পদক্ষেপ নিতে বলে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহনকারী হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠল শান্তির বিনিময়মূল্য।
এরপর কী?
পাকিস্তান এখন পর্যন্ত একটি স্পষ্ট রূপরেখা দাঁড় করিয়েছে: তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, আলোচনার নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক।
তবে এই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি এবং যুদ্ধবিরতির পরিধি নিয়ে পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
পরিণতি এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি কথা স্পষ্ট — এই সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উপস্থিতি আঞ্চলিক কূটনীতিতে ইসলামাবাদের ভূমিকাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।