ইসলামাবাদে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বৈঠক শুরুর অপেক্ষায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বাধা হয়ে দাঁড়ালেও শেষ মুহূর্তে আংশিক যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিতে সংকট কাটার আভাস

ইসলামাবাদে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বৈঠক শুরুর অপেক্ষায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত সরাসরি আলোচনা শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শুরু হওয়ার কথা। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে শেষ মুহূর্তে সংকট দেখা দিলেও বৈরুত ও দাহিয়েহ্ এলাকায় হামলা সাময়িকভাবে থামার ইঙ্গিত মিলতে আলোচনার পথ কিছুটা সুগম হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণে বলেন, শনিবার উভয় দেশের নেতৃত্ব ইসলামাবাদে উপস্থিত হবেন। তিনি পরিস্থিতিকে ‘কঠিন পর্যায়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি একটি ‘মেক-অর-ব্রেক’ মুহূর্ত — অর্থাৎ এই আলোচনা সফল না হলে পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত গুরুতর।

ইরানি প্রতিনিধিদল শনিবার ভোরে ইসলামাবাদ পৌঁছায়। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, জাতীয় পরিষদের স্পিকার আইয়াজ সাদিক, প্রতিরক্ষা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।

ইসহাক দার আশা প্রকাশ করেন যে উভয় পক্ষ গঠনমূলক মনোভাব নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবে এবং পাকিস্তান এই সংকটের টেকসই সমাধানে মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখবে।

মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি শনিবার সকালে ইসলামাবাদ পৌঁছানোর কথা। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, পররাষ্ট্র দপ্তর ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা।

১৯৭৯ সালের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটি হবে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। তবে আলোচনা শুরুর আগেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় লেবানন প্রশ্ন। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে আটক ইরানি সম্পদ — আনুমানিক ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার — মুক্ত না হলে তেহরান আলোচনায় বসবে না।

ঘালিবাফ বলেন, এই দুটি শর্ত ‘আলোচনা শুরুর আগেই পূরণ করতে হবে।’

দিনভর ইসলামাবাদ, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নিরন্তর নেপথ্য যোগাযোগ চলে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররাও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বৈরুত ও দাহিয়েহ্ এলাকায় ইসরায়েলি হামলা আপাতত বন্ধ থাকার খবর আসে, যা ইরানের অন্যতম প্রধান শর্ত পূরণ করে।

একজন ইরানি কর্মকর্তা জানান: “বৈরুত ও দাহিয়েহ্‌কে রেড লাইন ঘোষণা করেই আমরা হামলা থামাতে বাধ্য করেছি এবং পরিষ্কার বলেছি, ইসরায়েল এই সীমা আবার অতিক্রম করলে আলোচনা বন্ধ।”

তবে দক্ষিণ লেবাননের অন্য এলাকায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকে এবং সেখানে কমপক্ষে ২৩ জন নিহত হন।

ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতির প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে ১০০টিরও বেশি হামলা চালায়, যাতে শত শত মানুষ প্রাণ হারান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেবানন পরিণত হয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রধান বিভাজনরেখায়।

ইরানের দাবি, যুদ্ধবিরতি হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে প্রযোজ্য হতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লেবাননে হামলাকে যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে বলে বিবেচনা করছে, যদিও প্রাথমিক সমঝোতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ইরান দাবি করে। এই মতভেদ বারবার কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ওয়াশিংটন ছাড়ার আগে ভ্যান্স আলোচনাকে সম্ভাব্য ‘ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেন এবং মার্কিন সৎ উদ্দেশ্যে আলোচনার প্রস্তুতির কথা জানান। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ইরান কালক্ষেপণের কৌশল নিলে যুক্তরাষ্ট্র তা সহ্য করবে না।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ইরানের হাতে ‘বেশি তাস’ নেই এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান আবার শুরু হতে পারে। তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শিপিং নিয়ন্ত্রণের সমালোচনাও করেন, যা এই সংকটে তেহরানের অন্যতম লিভারেজ হিসেবে বিবেচিত।

আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব ওয়াশিংটন সাধারণ কাঠামো হিসেবে মেনে নিয়েছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং সম্ভবত পারমাণবিক উপকরণ অপসারণের দাবি জানাবে। অন্যদিকে ইরান চায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক অধিকারের স্বীকৃতি, হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি কাঠামো এবং আটকে পড়া তহবিলে প্রবেশাধিকার।

আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং ছাড়ের ক্রম নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা মনে করছেন, এজেন্ডার ব্যাপকতা বিবেচনায় দুই দিনের প্রাথমিক বৈঠকে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম। সর্বোচ্চ যা আশা করা যায় তা হলো, ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি রোডম্যাপ বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমনে কিছু সীমিত সমঝোতা।

লেবাননে চলমান সংঘাত, উপসাগরীয় শিপিং লেনে বিঘ্ন এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশে ইসলামাবাদের এই বৈঠক একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ — তবে সেই সুযোগ কাজে লাগবে কিনা, তা নির্ভর করছে উভয় পক্ষের সদিচ্ছার ওপর।