গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রবিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দীর্ঘ আলোচনা শেষে কোনো চুক্তি ছাড়াই বিদায় নিয়েছে। চলমান ৪০ দিনের মার্কিন-ইরান যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশায় পুরো বিশ্ব এই আলোচনার দিকে তাকিয়ে ছিল।
এর আগে দুই দেশ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। সেই যুদ্ধবিরতি আদায়ে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে এবং ইসলামাবাদ বৈঠকেরও আয়োজন করে।
আলোচনা শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘খারাপ খবর হলো আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। আমি মনে করি এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ।’ তিনি আরও জানান, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ না করাসহ আমেরিকার বেশ কয়েকটি মূল শর্ত তেহরান মানতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত’ দাবিই চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, কিছু বিষয়ে দুই পক্ষ ‘সমঝোতায়’ পৌঁছেছে, তবে দুই থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতপার্থক্য এতটাই বেশি যে শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি সম্ভব হয়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, আলোচনা এখানেই শেষ হবে না। তিনি বলেন, এত উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পাঠানোই প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে সত্যিকার আগ্রহী। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে ওয়াশিংটন এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক কলামিস্ট ড্যানিয়েল ডিপেট্রিস বলেন, পারমাণবিক ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালী এবং যুদ্ধ সমাপ্তির শর্ত — এত জটিল ও বহুস্তরীয় সমস্যা মাত্র ২১ ঘণ্টায় সমাধান করা বাস্তবসম্মত ছিল না। তাঁর মতে, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের পরেও ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করে তেহরান নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।
সাংবাদিক রেজা আহমাদ রুমি বলেন, এই আলোচনায় দুই পক্ষের মূল অবস্থান স্পষ্ট হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন চাইছে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণে যাচাইযোগ্য সীমা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন, আর তেহরান ছাড় দিতে রাজি নয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে। তিনি বলেন, ‘এটি কূটনীতি — এক দফার চুক্তি নয়।’ আলোচনা ভেঙে পড়লে বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। সেই বাস্তবতাই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি।
সাংবাদিক খুররম হুসাইন বলেন, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিই মূলত আলোচনার সবচেয়ে বড় অন্তরায়। তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে সামরিক পথে প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ আমেরিকার কাছে নেই — ফলে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
সাংবাদিক ইফতিখার ফিরদৌস বলেন, দুই পক্ষের বিবৃতিতে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কূটনৈতিক মানসিকতার প্রকাশ দেখা গেছে। ইরান এই সংঘাতকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখছে, আর যুক্তরাষ্ট্র দেখছে কৌশলগত সুবিধা ও জাতীয় স্বার্থের লেন্সে।
চুক্তি না হলেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অর্জনকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রেজা আহমাদ রুমি বলেন, দশকের বৈরিতার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানকে একই কূটনৈতিক পরিসরে নিয়ে আসার মাধ্যমে পাকিস্তান ভূ-রাজনীতির প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
অ্যাংকরপার্সন কামরান ইউসুফ বলেন, এই আলোচনা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এযাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ।
তবে কলামিস্ট নিয়াজ মুর্তজা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই রাজনীতিতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকিমুক্ত নয়, কারণ দেশটির নিজস্ব আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা ইতিমধ্যেই বহুমাত্রিক।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দার জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ মধ্যস্থতার ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। বিশ্লেষকদের সার্বিক পর্যবেক্ষণ হলো — এই দফায় চুক্তি না হলেও কূটনীতির দরজা বন্ধ হয়নি। পরবর্তী আলোচনা কোথায়, কখন এবং কোন শর্তে হবে — সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।