ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সহজ জয়ের পথ নেই

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অনেকটা সেই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন।

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সহজ জয়ের পথ নেই

মিডল ইস্ট আই

ইসলামাবাদের আলোচনা ভেঙে পড়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল হরমুজ প্রণালি অবরোধ ঘোষণা এবং সেখান দিয়ে যাওয়া তেলবাহী জাহাজ আটকের হুমকি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরানকে ক্ষতি করার বদলে উল্টো তাদেরই সুবিধা করে দিচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির সময়ে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। ইরাকি অপরিশোধিত তেল বোঝাই আরেকটি জাহাজ ‘ওশান থান্ডার’ গত সপ্তাহেও প্রণালি পার হয়।

ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছেন, ইরানকে মাশুল পরিশোধ করে যাওয়া প্রতিটি জাহাজকে মার্কিন নৌবাহিনী আটক করবে। কিন্তু ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড পরে জানায়, ইরান-ভিন্ন বন্দরে যাওয়া জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, যেসব জাহাজ এখন ইরানকে মাশুল দিচ্ছে, সেগুলোই আটকানো হবে না।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সামরিক বিশ্লেষণ পরিচালক জেনিফার কাভানা বলেছেন, প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ আরও বাড়বে এবং তেলের দাম আকাশ ছোঁবে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ভালি নাসর বলেন, এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য সুবিধাজনক, কারণ এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর তাদের চাপ দীর্ঘস্থায়ী করে। তিনি সতর্ক করেন, ইরান চাইলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করে দিতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১১৯ ডলারে উঠেছে, অর্থাৎ মাত্র ৩৯ দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।

উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে যে ইসলামাবাদ আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। ট্রাম্প নিজে বলেছিলেন, চুক্তির শর্তগুলো সামরিক অভিযানের চেয়ে ভালো ফলাফল দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে সম্মত হননি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইসলামাবাদ সমঝোতার মাত্র এক পা দূরে থেকে আমরা চরমপন্থী অবস্থান, লক্ষ্য পরিবর্তন ও অবরোধের মুখে পড়লাম।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর পেছনে ইসরায়েলের ভূমিকা রয়েছে। ইসলামাবাদ আলোচনায় নিজেকে বাদ দেওয়া মেনে নেয়নি তেল আবিব। সাবেক মার্কিন আলোচক রব ম্যালি বলেছেন, ‘ইরান যে দাবি ইতিমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেটা পুনরায় তুলে ধরতে ২১ ঘণ্টাও অনেক বেশি; আর সত্যিকারের আলোচনার জন্য সেটা অনেক কম।’

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ইরান এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, ইরানের কাছে এখনো অর্ধেক রকেট লঞ্চার ও ড্রোন মজুত আছে এবং ভূগর্ভস্থ লঞ্চার থেকে নিক্ষেপযোগ্য হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র অক্ষুণ্ণ রয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমারু বিমানের ১৩ হাজার হামলার পরও ইরান নিজেকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে।

চীন ও রাশিয়ার সমর্থন এখন শুধু কূটনৈতিক নয়, গোয়েন্দা তথ্য বলছে চীন ইরানে নতুন বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে হুতিরা সক্রিয়, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি অভিযান মোকাবিলা করছে এবং ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো কুয়েতে হামলা চালাচ্ছে।

ইরান বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে — বৈশ্বিক তেল উৎপাদন দিনে ৯০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমেছে এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

ব্র্যান্ডন কার ও ত্রিতা পার্সির বিশ্লেষণ বলছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে আবু মুসা, লারাক ও খার্গ দ্বীপ দখল করতে হবে। দ্বীপগুলো দখল করা সম্ভব হলেও ধরে রাখা হবে আসল চ্যালেঞ্জ।

ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ক্রমাগত হামলায় মার্কিন সেনারা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। মেরিন ইউনিটগুলো সর্বোচ্চ ১৫ দিন স্বনির্ভর থাকতে পারে, তারপর রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

খার্গ দ্বীপে হামলা হলে ইরান পারস্য উপসাগরের প্রতিটি তেল টার্মিনালে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। ফলে হরমুজ দখল করা গেলেও পাঠানোর মতো তেল আর নাও থাকতে পারে।

গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলো এখন বিভক্ত। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ‘যুদ্ধ শেষ করার’ পক্ষে; কাতার ও ওমান চাইছে অবিলম্বে শান্তি। কুয়েত ও সৌদি আরব মাঝামাঝি অবস্থানে।

ট্রাম্প চীনকে ৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিয়েছেন যদি বেইজিং ইরানকে সামরিক সহায়তা দেয় বলে প্রমাণ মেলে। এই হুমকিকে বিশ্লেষকরা আগামী মাসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগে চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছেন।

ইরানি বিশ্লেষক হাসান আহমাদিয়ান বলেন, ইরানের দরকার শুধু টিকে থাকা — সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই শুধু ধৈর্য ধরলেই জ্বালানি বাজারে বিপুল চাপ তৈরি হবে।

গাজায় নেতানিয়াহু যেমন হামাসকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেননি, ট্রাম্পও ইরানকে নতজানু করার সহজ পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই যেন একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে — এবং সেই পথ যত দীর্ঘ হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিও তত গভীর হবে।