আল–জাজিরা
ইরানের বিরুদ্ধে ‘চূড়ান্ত লড়াই’ ও ‘ঐতিহাসিক বিজয়ের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দেশটির জনমত জরিপে দেখা গেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলি এই যুদ্ধবিরতির বিরোধী এবং তারা মনে করছেন, সংঘাত আবার শুরু হবে।
জরিপে কী উঠে এল
ইসরায়েলি ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস) রোববার এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। জরিপ অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া চরম সময়সীমার মাত্র ৯০ মিনিট আগে এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ওই সময়সীমার মধ্যে সমঝোতা না হলে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় ভয়াবহ হামলা চালানো হবে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৩ শতাংশ মনে করেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হবে। এ ছাড়া ৬৯ শতাংশ উত্তরদাতা লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন — লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা চলার মধ্যেও।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সমর্থনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু বলে আসছিলেন, এই যুদ্ধে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে, পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার নিশ্চিহ্ন হবে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং ইরানি রাষ্ট্র টিকে আছে — বিপর্যস্ত হলেও অপরাজিত। তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার আংশিকভাবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তার কৌশলগত প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
আমেরিকান-ইসরায়েলি রাজনৈতিক পরামর্শক, জনমত গবেষক ও সাংবাদিক দালিয়া শেইন্ডলিন বলেন, ‘নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ কতটুকু অর্জন করতে পারবে, সেটা অতিরঞ্জিত করে বলেছিলেন। শাসনব্যবস্থার পতন, পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্পূর্ণ ধ্বংস — এগুলো অর্জন করা সম্ভব ছিল না।’
বিরোধীদের সমালোচনা
নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও তাঁর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ যুদ্ধের শুরুতে সমর্থন জানালেও যুদ্ধবিরতির পর বলেন, ‘নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে একটি আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন, যে রাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলোতে ফোনে নির্দেশনা পায়।’ বামপন্থী গণতন্ত্রী দলের নেতা ইয়াইর গোলান আরও কড়া ভাষায় বলেন, ‘নেতানিয়াহু মিথ্যা বলেছেন। তিনি “ঐতিহাসিক বিজয়” ও “প্রজন্মের নিরাপত্তার” প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাস্তবে আমরা পেলাম ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ কৌশলগত ব্যর্থতা।’
অক্টোবর ৭-এর ছায়া
নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত আলন পিনকাস আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে বিজয় নেতানিয়াহুর জন্য অক্টোবর ৭-এর হামাস হামলার ঘটনাকে আড়াল করার সুযোগ দিত — যে হামলায় এক হাজার ১৩৯ জন নিহত হয়েছিলেন এবং যার দায় এড়ানোর চেষ্টার অভিযোগ এখনো নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রয়েছে।
পিনকাস বলেন, ‘জনমানসে নেতানিয়াহু এখন দুটি বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লেন।’
উল্লেখ্য, গত এক সপ্তাহে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল দাবি করছে, লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়েনি। এই হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়েছে। এ ছাড়া গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।