নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং ঢাকা ওয়াসার আওতাভুক্ত করার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার অধীনে থাকা এই প্রকল্পের অংশগুলোকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করারও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) রাত সাড়ে আটটায় জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে মোট পাঁচটি এজেন্ডা ছিল, তার মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকাটি তিনটি জেলার—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের সীমানায় অবস্থিত। এই প্রশাসনিক জটিলতার কারণে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশের কার্যক্রম পর্যাপ্ত ছিল না। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবাও নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। এলাকাটি সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত না হওয়ায় ওয়াসার সেবা পাওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না।

এসব সমস্যা সমাধান এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এলাকাটিকে বসবাসের উপযোগী করতে পূর্বাচলকে ডিএনসিসির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এর ফলে ওই এলাকার বাসিন্দারা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ বা সংস্কার, সড়কবাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং মশক নিয়ন্ত্রণসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা সহজেই পাবেন।
পাশাপাশি পূর্বাচলের বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকাটিকে ডিএমপির আওতায় আনার এবং কার্যকর পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার জন্য পুরো এলাকাকে ঢাকা ওয়াসার অধিক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদনও দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
জেলা পুনর্বিন্যাস
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পূর্বাচল এলাকার নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সুষ্ঠু প্রশাসনিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা এবং গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার অধীনে থাকা প্রকল্পের অংশগুলোকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব যৌক্তিক বিবেচনায় মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
দেশের বৃহত্তম পরিকল্পিত নগর প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহরের মোট আয়তন ছয় হাজার ২৬১ দশমিক শূন্য চার একর। এর মধ্যে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার দুটি মৌজায় এক হাজার ৫৮৯ দশমিক ৮৯ একর এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার ১৪টি মৌজায় চার হাজার ৪৩১ দশমিক ৪৫ একর জমি রয়েছে।
পাঁচ মৌজায় ৩০ সেক্টর
প্রস্তাবে মৌজা পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে ১৬টি মৌজায় বিভক্ত প্রকল্প এলাকাকে পাঁচটি বৃহৎ মৌজায় রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পূর্বাচল-১ থেকে পূর্বাচল-৫ পর্যন্ত পাঁচটি মৌজার অধীনে ৩০টি সেক্টরকে পুনর্বিন্যস্ত করা হবে।
নতুন বিন্যাস অনুযায়ী, পূর্বাচল-১ মৌজায় থাকবে সেক্টর ২৫, ২৬ ও ২৭। পূর্বাচল-২ মৌজায় সেক্টর ২২, ২৩, ২৪, ২৮, ২৯ ও ৩০। পূর্বাচল-৩ মৌজায় সেক্টর তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, ২০ ও ২১। পূর্বাচল-৪ মৌজায় সেক্টর দুই, নয়, ১০, ১৮ ও ১৯ এবং পূর্বাচল-৫ মৌজায় থাকবে সেক্টর এক, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭। প্রস্তাবিত মৌজা মানচিত্রে কোনো সেক্টরকে বিভাজন করা হয়নি এবং সব মৌজাই ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পুনর্গঠনে ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং সেবা প্রদানে সমন্বয় বাড়বে।
প্রকল্পের বর্তমান চিত্র
১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে গৃহীত এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায় ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। অধিকাংশ প্লটও হস্তান্তর করা হয়েছে। অনেক বরাদ্দগ্রহীতা ভবন নির্মাণ শুরু করে দিয়েছেন। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দ্বিতীয় একটি প্রকল্প এখন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের লে-আউট নকশায় ৩৮ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি রাখা হয়েছে আবাসিক প্লটের জন্য। সড়ক ও ফুটপাতের জন্য ২৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, প্রশাসনিক ও ইউটিলিটি কাজে ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ক্রীড়া-পার্ক-বনায়নে ১১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং লেক ও খালের জন্য সাত দশমিক ৬০ শতাংশ জমি রাখা হয়েছে।
প্রায় ৩০ হাজার প্লট
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে মোট আবাসিক প্লট ২৬ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে তিন কাঠার ১১ হাজার ২০৯টি, পাঁচ কাঠার ১০ হাজার ৩৬১টি, সাড়ে সাত কাঠার দুই হাজার ৬১৮টি এবং ১০ কাঠার দুই হাজার ২৫টি প্লট রয়েছে। মোট আবাসিক প্লটের মধ্যে সাত হাজার ৮৬৪টি বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রকল্পের মূল অধিবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য।
আবাসিক প্লটের বাইরে আরও তিন হাজার ৫৬৩টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, ৪৭২টি প্রশাসনিক, এক হাজার ৩৩টি বাণিজ্যিক এবং দুই হাজার ৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নগর সুবিধার জন্য। প্রকল্প এলাকায় সড়ক, সেতু, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ। ইতিমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে।
পূর্বাচল এক নজরে: শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত পূর্বাচল নতুন শহর উত্তরে গাজীপুর ও দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সংযুক্ত। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দূরত্ব সাড়ে ছয় কিলোমিটার। কুড়িল থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত আট লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। শহরের ভেতরে রয়েছে ৪৮ কিলোমিটার লেক এবং ৩৬৫ কিলোমিটার সড়ক।