গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে গত বছরের আগস্টে এ দুই কমিটি গঠিত হয়। তাদের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সম্প্রতি একই ধরনের মত দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘রিভিউ কমিটি’।
এসব কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে করিডোরটি বিআরটি ব্যবস্থার বদলে সব ধরনের যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আর নির্মাণ ব্যয় তুলে আনতে যানবাহন থেকে আদায় করা হবে টোল। এদিকে, ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিআরটি প্রকল্পটি মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিআরটি হলো বাসের জন্য বিশেষ লেনভিত্তিক ব্যবস্থা, যা মেট্রোরেলের মতো যানজটহীন যাতায়াত সুবিধা দেয়। গাজীপুরের শিববাড়ি থেকে ঢাকার বিমানবন্দরের মধ্যে বিআরটি গড়ে তুলতে ২০১২ সালে প্রকল্পটি নেয় তৎকালীন সরকার। সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করে এখন পর্যন্ত বিআরটির ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নকশাগত জটিলতার কারণে প্রকল্পটি এখন বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিআরটি করিডোরে নকশাগত ত্রুটির জন্য প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দায়ী করে বিপুল অর্থ অপচয়ের জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে ‘রিভিউ কমিটি’।
প্রকল্পটির মূল অবকাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। দুটি সংস্থাই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা তা জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অন্যদিকে প্রকল্পটিতে পরামর্শক হিসেবে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনাল ও ব্রিসবেন সিটি এন্টারপ্রাইজ, ফ্রান্সের সিস্ট্রা এসএ এবং বাংলাদেশের এসিই কনসালট্যান্স লিমিটেড। তাদের কাজ ছিল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা।
এছাড়া বিআরটি করিডোর পরিচালনা ও ব্যবসায়িক মডেল তৈরির দায়িত্ব যৌথভাবে পায় ভারতের সিইপিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন। যদিও পরবর্তী সময়ে সিইপিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট প্রকল্পটি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।
ব্যবসায়িক মডেল তৈরির কাজে বুয়েটের প্রতিনিধি দলে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক।
কাজ ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমরা বিআরটি প্রকল্পের কনসালট্যান্ট হিসেবে যুক্ত ছিলাম। পরে যখন দেখি অপারেশনাল মডেল বাস্তবায়নের পথে গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তখন আমরা সরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ আমরা বুঝেছিলাম, ভবিষ্যতে এ ব্যর্থতার দায় আমাদের ঘাড়েও আসতে পারে।’
বিআরটির নকশাগত ত্রুটির দায়দায়িত্ব এবং প্রকল্পটি নিয়ে করণীয় ঠিক করতে গত বছর মন্ত্রণালয় থেকে দুটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। আর এ দুই কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে করা হয় আরেকটি রিভিউ কমিটি, যার নেতৃত্ব দেন ড. সামছুল হক।
রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০ কিলোমিটার করিডোরের অনেক অংশ, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল এলাকা বিআরটি ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত নয়। অনেক জায়গায় সার্ভিস রোড ও ফুটপাত নেই, আর সড়কের মাঝখানে মাত্র দুটি লেন থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচলে বাধা পড়েছে। যদিও কার্যকর বিআরটির জন্য সাধারণত আরো প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন। এমন অবস্থায় বিআরটি প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলমুখী পাশের লেনে বড় ধরনের যানজট তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সরকার চাইলে এ প্রকল্প থেকে আয় করতে বিআরটি লেন ব্যবহারের জন্য টোল নিতে পারে এবং এটিকে একটি উন্নত দ্রুতগতির সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ঋণ পরিশোধেও সহায়তা করবে। না হলে এটিকে সাধারণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে টঙ্গী ওভারপাস এলাকায় টোল প্লাজা করা এবং বিদ্যমান বিআরটি স্টেশনগুলোকে সংস্কার করে টোল আদায়ের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের দুই কমিটির প্রতিবেদন এবং এ দুই কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার আলোকে এখন বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেখান থেকেই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’