গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশের ২৩টি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ শোধ না করে নাভানা গ্রুপের মালিকপক্ষ সিঙ্গাপুর, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত পাঁচটি দেশে অর্থ সরিয়েছেন বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে টাইমস বাংলাদেশ পত্রিকা।
পত্রিকাটির অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, গ্রুপটির মালিকপক্ষ অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে ব্যাংক হিসাব খুলেছেন, আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ডে বিনিয়োগ করেছেন, বিদেশি বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছেন এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন।
কীভাবে গড়ে উঠল এই সাম্রাজ্য?
টাইমস বাংলাদেশের হাতে আসা নথি, আন্তর্জাতিক করপোরেট রেকর্ড ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ২০০৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অন্তত ১৫ বছর ধরে বিদেশে এই আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন নাভানা গ্রুপের মালিকপক্ষ। এই সময়ে অন্তত আট কোটি ২৬ লাখ টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি, তবে প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত নাভানা গ্রুপ অটোমোবাইল, নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে। একসময় টয়োটা ও হিনো ব্র্যান্ডের একমাত্র পরিবেশক ছিল প্রতিষ্ঠানটি।

সিঙ্গাপুর থেকে দুবাই হয়ে হংকং, তারপর কানাডা
টাইমস বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাভানা গ্রুপের চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল ২০০৭ সালের আগে থেকেই তার ছেলে সাইফুল ইসলাম সুমনের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে যৌথ হিসাব পরিচালনা করতেন, যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার সমমূল্যের আমানত ও হেজ ফান্ড বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১৪ সালের একটি নথিতে দেখা গেছে, একটি প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বন্ড ইস্যুর আইনি খরচ বাবদ প্রায় ৯৩ হাজার মার্কিন ডলার দুবাই হয়ে হংকংয়ের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক টাইমস বাংলাদেশকে জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো লেনদেনের অনুমোদন তাদের কাছে ছিল না।
ক্যারিবিয়ান নাগরিকত্বের জন্য কত অর্থ ব্যয় হয়েছে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাভানা গ্রুপের সাইফুল ইসলাম ২০২০ সালে এবং তার ভাই সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ২০২২ সালে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পাসপোর্ট নিয়েছেন। কর স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশটির নাগরিকত্ব পেতে দুই ভাই মিলে অন্তত ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি। বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, এক্ষেত্রেও কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধান কেন থেমে গিয়েছিল?
টাইমস বাংলাদেশ জানিয়েছে, সাইফুল ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধে কানাডায় পাচারের অর্থে ব্যবসা গড়ে তোলার অভিযোগে ২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করলেও কয়েক মাসের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের দুই কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রভাবেই সেই অনুসন্ধান থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
একই বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে গ্রুপটিকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার চলতি মূলধন সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে তিন কিস্তিতে ৫০০ কোটি টাকা নতুন ঋণ পায় নাভানা। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে টাইমস বাংলাদেশ জানিয়েছে, শফিউল ইসলাম কামালের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই এই সহায়তার সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কী বলছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমস বাংলাদেশকে বলেছেন, নথিপত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে নাভানা গ্রুপের পরিচালকদের সঙ্গে অর্থ পাচারের বিষয়টি জড়িয়ে আছে, কারণ বিদেশে অর্থ স্থানান্তর বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কোনো অনুমোদন নেননি। বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে পুরো চিত্র উঠে আসবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৩টি ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা ফান্ডেড ঋণ নিয়েছে নাভানা গ্রুপ, যা দিয়ে দেশের ১৩তম বৃহৎ ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটি। নন-ফান্ডেড দায়সহ মোট এক্সপোজার প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গ্রুপটির বিরুদ্ধে ১৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৭৮টি ঋণ-পুনরুদ্ধার মামলা করেছে।
নাভানা গ্রুপের প্রতিক্রিয়া
টাইমস বাংলাদেশ জানিয়েছে, এই অনুসন্ধান নিয়ে বক্তব্য জানতে নাভানা গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তারা কোনো জবাব দেননি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রশ্ন পাওয়ার পর তারা নম্বর ব্লক করে দেন বলেও উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি।