গাজীপুর কণ্ঠ, খেলা ডেস্ক
বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে ২ নম্বর ক্যাটেগরিতে ৭৪ ভোটের মধ্যে ৭৩টিই পেয়েছেন তামিম ইকবাল। সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে পরিচালক হওয়ার পর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতিও নির্বাচিত হন তিনি।
৩৭ বছর বয়সী সাবেক এই অধিনায়ক বিসিবির ২১তম সভাপতি। দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্তা সংস্থার সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানও তিনিই।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ফাহিম সিন্হা। নাজমুল হাসান পাপন বোর্ড সভাপতি থাকার সময়ও তিনি পরিচালক ছিলেন, পরিচালক ছিলেন ফারুক আহমেদের নেতৃত্বাধীন বোর্ডেও।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সহ-সভাপতি থাকার কথা দুজন। তবে সংবাদ সম্মেলনে তামিম জানালেন, বোর্ড পরিচালকদের সম্মতিতে আপাতত একজনই সভাপতি রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন করা হতে পারে আরেকজন।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বিসিবি কার্যালয়ে রবিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পরিচালক পদে ভোটগ্রহণ হয়। নির্বাচনে লড়াইয়ের আবহ অবশ্য খুব বেশি ছিল না। ৮ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিলেন ভোটের আগেই।
তাদের মধ্যে ৭ জনই ক্যাটেগরি-১ বা আঞ্চলিক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধি। এই ক্যাটেগরিতে ভোট হয় দুটি বিভাগে। খুলনা বিভাগের দুটি পদে খুলনা বিভাগে দুটি পরিচালক পদে নির্বাচিত হন খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার মোঃ শফিকুল আলম ও যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার শান্তনু ইসলাম। ১০টি করে ভোট পান দুজনই। চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার মোঃ আব্দুছ সালাম পরাজিত হন দুটি ভোট পেয়ে।
বরিশাল বিভাগে একটি পদের নির্বাচিত হন বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার মোঃ মিজানুর রহমান। বিপিএল দল ফরচুন বরিশালের চেয়ারম্যান এই ব্যবসায়ী ভোট পান ৫টি। ভোলা জেলা ক্রীড়া সংস্থার মোঃ মুনতাসির আলম চৌধুরী পান ১ ভোট।
ভোটের মূল লড়াই ছিল ক্যাটেগরি-২ বা ক্লাব প্রতিনিধিদের লড়াইয়ে। ১২টি পদের জন্য লড়াইয়ে ছিল ১৬ জন। এখানে ৭৬ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭৪ জন। ৭৩টি পেয়েছেন ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাবের কাউন্সিলর তামিম ইকবাল।
এছাড়াও এই ক্যাটেগরিতে নির্বাচিত হয়েছেন সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ (ফেয়ার ফাইটার্স স্পোর্টিং ক্লাব), ইসরাফিল খসরু (এক্সিউম ক্রিকেটার্স), মাসুদুজ্জামান (মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব), ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক (বসুন্ধরা রাইডার্স), শানিয়ান তানিম নাভিন (ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাব), ফাহিম সিন্হা (আবাহনী লিমিটেড), সাকিব আহমেদ সালাম (পূর্বাচল স্পোর্টিং ক্লাব), আসিফ রব্বানী (শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব), মির্জা ইয়াসির আব্বাস (আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব), মোঃ রফিকুল ইসলাম বাবু (ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্র) ও প্রফেসর ডাঃ সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম (ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব)।
মাত্র এক ভোটের জন্য হেরে গেছেন সৈয়দ বোরহানুল হোসেন (তেজগাঁও ক্রিকেট একাডেমি)। লড়াই খুব বেশি জমাতে পারেননি মোহাম্মাদ আমজাদ হোসেন (ট্রাই স্টেট ক্রিকেটার্স) , ফৈয়াজুর রহমান (উত্তরা ক্রিকেট ক্লাব) ও মেজর (অবঃ) ইমরোজ আহমেদ (কাঁঠালবাগান গ্রীন ক্রিসেন্ট ক্লাব)।
এই পরিচালকদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে বিসিবির গত পরিচালনা পর্ষদেও ছিলেন ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক ও শানিয়ান তানিম নাভিন। পরে তারা পদত্যাগ করেছিলেন।
ক্যাটেগরি-৩ তথা সাবেক অধিনায়ক, ক্রিকেটার ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা থেকে একটি পদে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মোঃ আলমগীর।
নির্বাচিত ২৩ পরিচালকের সঙ্গে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মনোনীত দুজন পরিচালকের নামও ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ও গাজীপুর মহানগরের পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার। তারা হলেন শেখ মোঃ রুহুল আমিন এবং মোঃ সরফরাজ আহমেদ।
এই দুটি নাম বেশ চমক হয়েই আসে অনেকের জন্য। ক্রিকেট আঙিনায় একদমই পরিচিত নেই তাদের।
পরিচালকদের ভোটে পরে সভাপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে তামিম একক প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনের প্রয়োজন পড়েনি।
আট মাসের মধ্যে বিসিবির দ্বিতীয় নির্বাচন এটি। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তামিমকে নিয়ে চারজন সভাপতি পেল দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া সংস্থাটি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন দিয়ে বিসিবিতে নাজমুল হাসান পাপপের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনয়নে পরিচালক হয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন ফারুক আহমেদ। কিন্তু তিনি দায়িত্বে থাকতে পারেন মাত্র ৯ মাস। নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর দায়িত্ব হারান তিনি। মূলত সেই সময়ের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুইয়ার হস্তক্ষেপেই পদ হারাতে হয় তাকে। পরে একইভাবে সভাপতি করা হয় আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে।
পরে গত ৬ অক্টোবর বিসিবি নির্বাচনে জিতে সভাপতি পদে রয়ে যান আমিনুল। কিন্তু সেই নির্বাচন বিতর্কের জন্ম দেয় তুমুল। নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী। পরে সেসব অভিযাগ খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৭ এপ্রিল আমিনুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়। ওই কমিটি বাদ দিয়ে ১১ সদস্যের নতুন অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করে এনএসসি, যেটির প্রধান হয় তামিম ইকবালকে। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে বলা হয় কমিটিকে।
সেই নির্বাচন হয়ে গেল ঠিক দুই মাসের মাথায়। নির্বাচিত হয়ে চার বছরের জন্য দায়িত্ব পেলেন তামিম।
এই পরিচালনা পর্ষদে অনেকেই সরকারী দল বিএনপি সংশ্লিষ্ট বা ঘনিষ্ঠ। রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত পরিচালক মির্জা ফয়সল আমীন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামের ভাই। এই মন্ত্রণালয়েরই প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়া–২ আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত পরিচালক হয়েছেন রাজশাহী বিভাগ থেকে।
সিলেট বিভাগের পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি। বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে সাইদ বিন জামান পরিচালক হয়েছেন ঢাকা বিভাগ থেকে। পানিসম্পদমন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর–৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর চাচা মঈন উদ্দিন চৌধুরী পরিচালক হয়েছেন চট্টগ্রাম থেকে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও যশোর–৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলামের ভাই শান্তনু ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন খুলনা বিভাগ থেকে।
ক্লাব ক্যাটেগরিতে নির্বাচনে জিতে পরিচালক হওয়াদের মধ্যে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদের বাবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইসরাফিল খসরুর বাবা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা ইয়াসির আব্বাসের বাবা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিকের বাবা কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম, আসিফ রাব্বানির বাবা বগুড়ার সাবেক এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। এছাড়াও প্রফেসর ডাঃ সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম ড্যাবের নেতা।