গাজীপুর কণ্ঠ, খেলা ডেস্ক
জশ ইংলিসকে আউট করেই হুঙ্কার ছুড়লেন নাহিদ রানা। অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ক্রিজ ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রায় তেড়ে গেলেন তিনি, হাত উঁচিয়ে কিছু বললেনও। নিশ্চয়ই তা সুখকর কিছু নয়! ইংলিসও প্রায় ক্ষেপে গেলেন। যদিও পাত্তা খুব একটা পেলেন না। গোটা ম্যাচের একটি প্রতীকি চিত্র বলা যায় সেটিকে। ম্যাচের বেশির ভাগজুড়েই এভাবে বাংলাদেশের দাপটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা ছিল অসহায়।
ম্যাচের ফলাফলেও সেটির প্রমাণ। ওয়ানডে ইতিহাসের সফলতম দলকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ।
এই ম্যাচটিকে বলা যায় ‘অপেক্ষা অবসান রাঙানো পর্ব।’ ১৫ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ এটি। সেখানেই ঘুচল ১৫ ম্যাচ ও ২১ বছর খরা। ২০০৫ সালে কার্ডিফের সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর এই সংস্করণে জয় ধরা দিল এই প্রথম।
শেষ নয় এখানেই। এই জয়ের নায়ক যিনি, তারও বাস্তবতাও তো একই! প্রায় চার বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলেন মোসাদ্দেক হোসেন। দলের নড়বড়ে সময়ে নেমে উপহার দিলেন ৭ চার ও ৩ ছক্কায় ৭০ বলে ৮৬ রানের ইনিংস। ফেরার দিনেই ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস!
এরপর বল হাতেও তিনি উজ্জ্বল, ফিল্ডিংয়ে নিলেন দারুণ এক ক্যাচ। রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তন তো একেই বলে!

মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার মোসাদ্দেকের সঙ্গে তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্তর ফিফটিতে ৫০ ওভারে বাংলাদেশ তোলে ২৮৪ রান। অস্ট্রেলিয়া ৯ উইকেটে ১৯১ রান তোলার পর বিরূপ আবহাওয়া শেষ হয়ে যায় ম্যাচ। ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে বাংলাদেশের জয় ৮৬ রানে।
গতি আর বাউন্সে আগুনঝরা বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং কাঁপিয়ে চার উইকেট শিকার করেন নাহিদ রানা। মোসাদ্দেকের শিকার দুটি।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ ধাক্কা খায় দ্বিতীয় ওভারেই। ন্যাথান এলিসের বলে চার মারার পরের বলেই বিদায় নেন সাইফ হাসান (৫)। এভাবে শক্ত হাতে ডিফেন্স করে আউট হতে দেখা যায় সাইফকে নিয়মিতই। ম্লিপে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন মার্নাস লাবুশেন।
একটু পর অবশ্য এলিসের বলেই শান্তর সহজ ক্যাচ ছাড়েন সেই লাবুশেন। প্রথম বলেই দারুণ স্ট্রেট ড্রাইভে চার মেরে শুরু করা ব্যাটসম্যান এরপর ছুটতে থাকেন। আরেক পাশে তানজিদ শুরু থেকেই ছিলেন সাবলীল। দুজনের ব্যাটে বাউন্ডারি আসতে থাকে নিয়মিত। ১৫ ওভারে ৯৭ রান তোলে বাংলাদেশ।
তানজিদের ফিফটি আসে ৪১ বলে। এরপর বেশি দূর যেতে পারেননি। এলিসের স্লোয়ার উড়িয়ে মারার চেষ্টায় থামে তার ইনিংস (৪৪ বলে ৫৪)। জুটি শেষ হয় ৯৬ রানে।
শান্ত পঞ্চাশে পা রাখেন ৫৭ বলে। এরপর একটু মন্থর হয়ে পড়েন। অনিয়মিত স্পিনার ম্যাট রেনশ জোড়া ধাক্কায় নাড়িয়ে দেন বাংলাদেশকে। নিজের বলে লিটন দাসের (৭) দুর্দান্ত ক্যাচ নেওয়ার পর তিনি থামিয়ে দেন শান্তর পথচলাও (৮৬ বলে ৬৭)।
১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন একটু নড়বড়ে। কিন্তু মোসাদ্দেক তাতে ভড়কে যাননি মোটেও। শুরু থেকেই এমন ব্যাটিং করতে থাকলেন, মনেই হলো না এত লম্বা সময় তিনি বাইরে ছিলেন!
ক্রিজে যাওয়ার একটু পরই অ্যাডাম জ্যাম্পাকে ছক্কায় উড়িয়ে দেন মাথার ওপর দিয়ে। বাউন্ডারি আসতে থাকে তার ব্যাটে নিয়মিত। আরেক প্রান্তে তাওহিদ হৃদয় ধুঁকছিলেন সিঙ্গল বের করতে। তবে উইকেট আগলে রেখে সহায়তা করেন তিনি জুটি গড়তে।
এই জুটির ৭৫ রান বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয় কাঙ্ক্ষিত স্কোরের পথে। ৫১ লে ৩১ রান করে হৃদয় ফেরেন জেভিয়ার বার্টলেটের স্লোয়ারে।
অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ (১২ বলে ৩) পারেননি ব্যাটিং ব্যর্থতার বলয় ছিঁড়ে বের হতে। দলের তিনশ ছোঁয়ার সম্ভাবনাও কমে যায় ওই সময়টায়।
তবে শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের সঙ্গে কার্যকর একটি জুটি গড়েন মোসাদ্দেক। ৪৯ বলে ফিফটি ছোঁয়ার পর শেষ সময়ের দাবিও মেটান মোসাদ্দেক। তাসকিনের ব্যাট থেকে আসে ১৬ বলে ২০ রান।
২৮৫ রান তাড়ায় জিততে হলে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ম্যাথু শর্টের ব্যাটে ঝড়ো শুরু। কিন্তু ইনিংসের প্রথম বলেই তার বেলস উড়িয়ে দেন তাসকিন।
লাবুশেনের দুঃসময় আরও দীর্ঘায়িত করে ১ রানেই তাকে থামান মুস্তাফিজুর রহমান। ২ রানে ২ উইকেট হারানোর পর কখনোই আর সেভাবে মনে হয়নি, জিততে পারে বাংলাদেশ।
ইনিংস শুরু করা কুপার কনোলি ও চারে নামা জশ ইংলিস চেষ্টা করেন জুটি গড়ার। সেটি সফল হতে দেননি নাহিদ রানা। ইংলিস উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন ১৯ রানে।
এরপর আরেকটি জুটি গড়ার চেষ্টা করেন কনোলি ও অ্যালেক্স কেয়ারি। এবার তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান মোসাদ্দেক। ৩৫ রানে বোল্ড হয়ে যান কনোলি। নাহিদ রানা আক্রমণে ফিরে ফিফটির আগেই ফেরান কেয়ারিকে (৪৭)।
এরপর অস্ট্রেলিয়া উইকেট হারায় টপাটপ। সাম্প্রতিক সময়ে ফর্মে থাকা রেনশকে ২ রানেই আটকে দেন মোসাদ্দেক। নাহিদের গতির সামনে একরকম কম্পমান দেখা যায় অস্ট্রেলিয়ার পরের ব্যাটসম্যানদের।
২৮ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারিয়ে বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে যায় তারা। শেষ জুটিতে ৩৫ রান যোগ করেন ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যাডাম জ্যাম্পা। এরপর বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে বন্ধ হয় খেলা। পরে নামে বৃষ্টি। ম্যাচের সমাপ্তি সেখানেই।
গ্রিন অপরাজিত থাকেন ৫২ রানে। তার পরও জয়টা বড় ব্যবধানেই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৮৪/৮ (সাইফ ৫, তানজিদ ৫৪, শান্ত ৬৭, লিটন ৭, হৃদয় ৩১, মোসাদ্দেক ৮৬*, মিরাজ ৩, তানভির ৫, তাসকিন ২০; বার্টলেট ১০-০-৬২-১, এলিস ১০-১-৩৮-৩, স্কট ৮-০-৫৭-২, গ্রিন ৪-০-৩১-০, শর্ট ৩-০-১৪-০, রেনশ ৮-০-৩৫-২, জ্যাম্পা ৭-০-৪৭-০)।
অস্ট্রেলিয়া: ৪২.২ ওভারে ১৯১/৯(শর্ট ০, কনোলি ৩৫, লাবুশেন ১, ইংলিস ১৯, কেয়ারি ৪৭, গ্রিন ৫২*, রেনশ ২, স্কট ২, বার্টলেট ১, এলিস ৮, জ্যাম্পা ৬*; তাসকিন ৫-০-২৮-১, মুস্তাফিজ ৫.২-০-২৪-২, নাহিদ ১০-০-৪১-৪, মিরাজ ৬-১-২৩-০, মোসাদ্দেক ১০-১-৩৭-২, তানভির ৬-১-৩৩-০)।
ফল: ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ৮৬ রানে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: মোসাদ্দেক হোসেন।