গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ভূমিকম্প সক্রিয় টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে ঢাকার জন্য বড় বিপদ আসতে পারে ভিন্ন কারণে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
গত ২২ জুন সোমবার রাত আটটা ২৮ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল চার দশমিক চার। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পূর্বে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে সেটা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকার মধ্যেই পড়ে।’
ঘন ঘন কাছাকাছি উৎপত্তি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় যত ভূমিকম্প হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছাকাছি।
চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৪২ কিলোমিটার।
এর আগে গত বছরের ২১ নভেম্বর পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হওয়া ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে, ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে। গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি হিসেবে এটি বিবেচিত।
তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছিল, ওই ভূমিকম্পে ঢাকায় চারজন, নরসিংদীতে পাঁচজন এবং নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আহত হন সাড়ে চার শতাধিক মানুষ, যার মধ্যে শুধু গাজীপুরেই আহত হন ২৫২ জন।
উল্লেখযোগ্য, ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরও তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মোট চারটি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর দুটি উপজেলায় এবং একটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডায়।
এরপরও ধারাবাহিকভাবে ভূমিকম্প অব্যাহত থাকে। ২২ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে তিন দশমিক তিন মাত্রার এবং একই দিনে ঢাকার বাড্ডায় তিন দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ২৭ নভেম্বর নরসিংদীর ঘোড়াশালে তিন দশমিক ছয় এবং চার ডিসেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে চার দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. বদরুদ্দোজা মিয়া সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সাম্প্রতিক এসব ভূমিকম্প টেকটোনিক কার্যকলাপের কারণে হতে পারে, আবার কোনো সক্রিয় ফল্টের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। তাঁর মতে, ‘অনেক সময় নতুন ফল্ট সৃষ্টি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এসব ভূমিকম্প মানুষকে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সাত মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকায় শীঘ্রই আসার সম্ভাবনা আছে। এখন এটা কবে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ২০ বছরও লেগে যেতে পারে।’
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ঢাকাকেন্দ্রিক বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস নেই। কিন্তু সীমান্তে বড় ভূমিকম্প আছে। আর আমার অভিজ্ঞতা বলছে, গত বছর দুয়েক ধরে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা একটু বেশি।’
কোথায় বড় বিপদ
অধ্যাপক আনসারীর মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ঐতিহাসিকভাবে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টিতে সক্ষম ফল্টগুলো। ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় এবং ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুরে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক রেকর্ড রয়েছে।
বাংলাদেশে পাঁচটি পরিচিত ফল্ট লাইন রয়েছে। মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত প্লেট বাউন্ডারিতে ১৭৬২ সালে আট দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। নরসিংদীর ওপর দিয়ে যাওয়া আরেকটি বাউন্ডারিতে অতীতে সাত মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড আছে। সিলেট থেকে ভারতের দিকে যাওয়া ফল্টে ১৯১৮ ও ১৯৬৯ সালে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এ ছাড়া ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালে আট দশমিক এক এবং মধুপুর ফল্টে ১৮৮৫ সালে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্পের তথ্য পাওয়া যায়।
বিপদ ‘ব্লাইন্ড ফল্টে’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচিত ফল্ট লাইনের বাইরেও রয়েছে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’, যা ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে শনাক্ত করা কঠিন। বাংলাদেশে দুটি চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট রয়েছে—একটি ময়মনসিংহে, অন্যটি রংপুরে। এই ফল্টগুলো থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব নয়, যা ঢাকার জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকার কোন এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ
ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, শুধু ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করলে মধুপুরের লাল মাটির গড়নের যেসব এলাকা রয়েছে যেমন রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান ও তেজগাঁও—সেগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে ভরাট জলাশয়ের ওপর গড়ে ওঠা পূর্ব ও পশ্চিমের এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
অধ্যাপক আনসারী অবশ্য সতর্ক করেছেন যে ভবনের কাঠামোগত মান পরীক্ষা না করে কোনো এলাকাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা সম্ভব নয়। বড় কোনো ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সূত্র: বিবিসি