গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে এবং তাদের নিরাপত্তা কৌশল পাশ কাটিয়ে সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতা ও চুক্তির পথে হাঁটছে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলো। এই অংশ হিসেবে সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণ ছাড়াই তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলাদা বৈঠক ও আলোচনা শুরু করেছে।
প্রথম আলোচনা শুরু হয়েছিল ইরান ও ওমানের মধ্যে। তারপর ওমান আর কাতার। এরপর ইরান ও সৌদি আরব, এবং সবশেষে কাতার ও সৌদি আরব। এই সব আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল—যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর আঞ্চলিক সহাবস্থান কেমন হবে, তার একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করা।
তবে কূটনীতির এমন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া তৎপরতা তো কেবল শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে এক নতুন স্বাভাবিকতার সমীকরণ নির্ধারণে সামনে এমন আরও বৈঠক ঘটতে যাচ্ছে।
মূলত, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত রাখা এবং এর ভবিষ্যত প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণের বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। ফলে নিরাপত্তা ছাড়ের বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে কী ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারে, এসব বিষয়ই আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আগস্টের ডেডলাইনকে সামনে রেখে যে আলোচনা চলছে, তার সমান্তরালেই—তবে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে—চলছে এই আঞ্চলিক তৎপরতা।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমে গেছে, যা বেশ কয়েক বছর ধরেই ঘটছে। এখনকার মূল ভাবনা হলো, ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজস্ব বোঝাপড়াতেই আসতে হবে— তারা যদি শেষপর্যন্ত নিজেরাই চুক্তি করে বসে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’
আপাতত, উপসাগরীয় দেশগুলোর জনসমক্ষে দেওয়া বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সম্প্রতি এক আঞ্চলিক জোটের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে—যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন— ‘মুক্ত, নিঃশর্ত ও অবাধ নৌ-যান চলাচল’-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর যেকোনো ধরনের টোল, ফি বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
তবে উপসাগরীয় কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান তার সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড এমনি এমনি হাতছাড়া করবে না। তাই সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে দেশগুলোর বাস্তববাদী হওয়া দরকার।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে, একটি সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন ধারণা নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে হরমুজ প্রণালি মাইনমুক্ত করার খরচ, পরিবেশগত অবক্ষয় প্রশমন, বন্দর শুল্ক অথবা বীমার উদ্দেশ্যে ‘পরিষেবা ফি’ আদায় করা হবে। তবে কোন সংস্থা এই ব্যবস্থাটি পরিচালনা করবে, কীভাবে তহবিল সংগ্রহ করা হবে এবং চূড়ান্ত অর্থ কাকে প্রদান করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
যদিও ইরান ইতোমধ্যেই এই পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে হরমুজ পরিচালনায় নবগঠিত ‘গালফ স্ট্রেইট অথরিটির’ মাধ্যমে জাহাজগুলোর জন্য ইরানি বীমা থাকা বাধ্যতামূলক করেছে তেহরান। তেহরান ও ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য যে ৬০ দিনের সময়সীমা ঠিক করেছে, তা শেষ হওয়ার পর থেকেই এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা।
গোনুল টোল বলেন, ‘ইরান এখন বুঝতে পেরেছে যে তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর একটি অস্ত্র—হরমুজ—রয়েছে, যা তারা যেকোনো সময় ব্যবহার করতে পারে। তাই এমন কোনো ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে ইরানই ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে থাকবে। এই সুবিধা ধরে রাখতে তারা সবকিছু করবে।’
তবে সমস্যা হলো- ইরান তাদের দাবি অনুযায়ী ট্রানজিট ফি’কে যতই সাজিয়ে-গুছিয়ে বলার চেষ্টা করুক না কেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্তুষ্ট হবেন না, যিনি বারবার বলেছেন কোনো ধরনের শুল্ক আরোপের অনুমতি দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা, এর ফলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হতে পারে। যদিও ট্রানজিট ফি নিষিদ্ধ করে, এমন একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চুক্তিতে বলা আছে, ‘জাহাজকে নির্দিষ্ট সেবা প্রদানের’ জন্য ফি ধার্য করার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে সম্ভবত বিকল্প খুব সামান্যই। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ, ইরান ও ওমান আটকে পড়া জাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য দুটি রুটের বিষয়ে সম্মত হওয়ার পরই হরমুজে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে হুমকি দেয় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)।
ইরান জোর দিয়ে বলেছে, নির্ধারিত পথগুলোর একমাত্র কর্তৃপক্ষ তারাই এবং সতর্ক করে দিয়েছে, ‘এই পথগুলোর বাইরে নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক’।
এর পরদিনই এক তাইওয়ানের একটি জাহাজ সংস্থা জানায়, প্রণালিতে তাদের একটি জাহাজ ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটিই এ ধরনের প্রথম হামলা। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, জাহাজটিতে এই ড্রোন হামলা পেছনে ইরানকে দায়ী করেছিল ইরান। এরপরই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র, যার পক্ষে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও। তবে উভয় পক্ষই আপাতত নতুন করে হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা সুফান সেন্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই হুমকি ও হামলাগুলো ‘সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলোর—বিশেষ করে ওমানের—জন্য প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি…ইরানকে সহযোগিতা না করলে আন্তর্জাতিক নৌ-পথে তারা হামলা চালিয়েই যাবে।’
অলাভজনক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া ইয়াসমিন ফারুক বলেন, এসব হামলা না হলেও ‘উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যেখানে আগের স্বাভাবিক অবস্থা হয়তো আর ফিরবে না। আঞ্চলিক আলোচনার টেবিলে তারা এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতেই তুলে নিতে যাচ্ছে।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায় সৌদি আরব নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি ও এককভাবে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। এর বাইরে ইরাককে নিয়ে আরেকটি জোট তৈরি হতে পারে, যাদের অর্থনীতি অনেকটাই এই প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে থাকা সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হলো তাদের আর্থিক সক্ষমতা— ইরানে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা। কারণ নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির অর্থনীতি চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ